জামায়াতকর্মী শাহাদাত হত্যা মামলার তদন্তে নতুন মোড়

হত্যার নেপথ্যে শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সাবেক নেতার ইন্ধন!

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে মো. শাহাদাত (৩০) নামে এক জামায়াতকর্মী হত্যার নেপথ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। হত্যাকান্ডের পেছনে জামায়াতের অঙ্গ সংগঠন শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের স্থানীয় সাবেক এক নেতার ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ নিহতের পরিবারের। চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল দিবাগত রাত ১১টার দিকে সাতকানিয়ার দক্ষিণ ঢেমশা রাস্তার মাথা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে ‘সামির হোটেল’র সামনে হত্যার এই ঘটনা ঘটে। 

মামলার এজাহারের বর্ণনা অনুযায়ী, সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে মুখোশধারী সন্ত্রাসীদের ১৫ সদস্যের একটি দল ঘটনাস্থলে আসে। লোহার রড, হকিস্টিক ও লাঠি দিয়ে মারধরের এক পর্যায়ে মামলার এক নম্বর আসামি তানভীর হোসেন তুর্কী (২৫) এবং দুই নম্বর আসামি মো. কামাল ওরফে পিচ্ছি কামাল শাহাদাতের মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে উপজেলার একটি বেসরকারি হাসপাতালে এবং পরে নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। ঘটনার দুই দিন পর সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান শাহাদাত। 

এ ঘটনায় তানভীন ও পিচ্চি কামালসহ ৯ জনের নাম উল্লেখ করে সাতকানিয়া থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহত শাহাদাতের মা ছায়েরা খাতুন। মামলার অপর আসাসিরা হলেন, সৈয়দ আহমদ, শাহাদাত হোসেন মিশলু, মো. ফারুক ওরফে ওমর ফারুক, মো. আকিব ওরফে আকিবুল ইসলাম, কফিল উদ্দিন, মো. সাইফুল ইসলাম, মো. হেলাল ও মো. নোমান। 

পুলিশ সুত্র জানিয়েছে, মামলার ৬ নম্বর আসামি কফিল উদ্দিন উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নিয়েছেন। গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দি আছেন মামলার ৭ নম্বর আসামি মো. সাইফুল ইসলাম।

মামলার বাদী নিহত শাহাদাতের মা ছায়েরা খাতুনের অভিযোগ, এক নারীর সঙ্গে ওই নেতার আপত্তিকর একটি ছবি তার ছেলে শাহাদতের মোবাইলে ছিল। এছাড়া ওই নেতার কাছে ২৬ লাখ টাকা পাওনা ছিল তার ছেলে শাহাদাতের। এছাড়া শাহাদাত হত্যাকান্ডের তিন মাস আগে মামলার ২ নম্বর আসামি পিচ্চি কামালকে মাদকসহ আটক করেছিল সেনাবাহিনী। কামালকে আটক করানোর পেছনে শাহাদাতের ভূমিকা রয়েছে এমন সন্দেহ থেকে তার ছেলেকে নির্মমভাবে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়া হত্যাকান্ডের পর পর মামলা দায়ের করতে ভিকটিম শাহাদাতের পরিবারকে ওই নেতা চাপ দিয়েছিলেন।

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশের একটি সুত্র জানিয়েছে, মাদকসহ পিচ্চি কামালকে আটক এবং পরে গ্রেপ্তারের ঘটনায় করা মামলায় শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সাবেক ওই নেতার ভাগিনাকেও আসামি করা হয়। পাওনা টাকা নিয়ে পূর্বের বিরোধ, নারীর সঙ্গে আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও থাকা এবং নিজের ভাগিনা মাদক মামলার আসামি হওয়ার জেরে ওই নেতা পিচ্ছি কামালসহ অপরাপর আসামিদের প্ররোচনা দিয়ে শাহাদাতকে হত্যা করা হতে পারে। 

সম্পতি মামলার এজাহারে অভিযুক্ত ৬ নম্বর আসামি কফিল উদ্দিনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে বাদীর ছেলে মোবারক হোসেনের কখোপকথনেও উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। মামলার এজাহারে কারা কারা আসামি হবেন সে বিষয়টি ঠিক করে দিয়েছিলেন স্থানীয় নুরুল আলম মেম্বার। তড়িঘড়ি করে মামলা করতে তিনিই (নুরুল আলম মেম্বার) চাপ দিয়েছিলেন বলে কথোপকথনে উঠে এসেছে। কথোপকথনের ওই রেকর্ডটি দেশ রূপান্তরের কাছে আছে। 

মামলার ৬ নম্বর আসামি কফিল উদ্দিনের বন্ধু মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শাহাদাতের হত্যাকান্ড ঘটেছিল ২৬ এপ্রিল দিবাগত রাতে রাস্তার মাথা এলাকায়। কিন্তু রাত ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত কফিল আমার সঙ্গে ছিল। আমরা দুজন ঘটনার রাতে ঘটনাস্থল থেকে অন্তত চার কিলোমিটার দূরে এসবিএম ব্রিকফিল্ড এলাকায় অবস্থান করছিলাম। মামলার ১ নম্বর আসামি তানভীর হোসেন তুর্কি (২৫) সম্পর্কে কফিল উদ্দিনের ছোটভাই। ঘটনায় জড়িত না থাকা সত্ত্বেও অহেতুক তাকে হয়রানি করতে মামলায় জড়ানো হয়েছে।’

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সাতকানিয়া থানার উপ-পরিদর্শক মাহবুব ইসলাম জানান, মামলার ২ নম্বর আসামি পিচ্ছি কামালই ঘটনার মূলহোতা। মামলায় ৯জনকে আসামি করা হলেও হত্যাকান্ডের সঙ্গে তিন থেকে চারজন সরাসরি জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ৬ নম্বর আসামি কফিল উদ্দিনের বিষয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘মামলার ১ নম্বর আসামি তানভীর হোসেন তুর্কি সম্পর্কে কফিলের ছোটভাই। তানভীর নানা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে। ১ নম্বর আসামির ভাই বলে কফিল উদ্দিনকেও শাহাদাত হত্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে মামলার তদন্ত শেষে প্রকৃত সত্যটা বেরিয়ে আসবে। 

মামলার আসামি পিচ্ছি কামালসহ অন্যান্য আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ বাদী ছায়েরা খাতুন বলেন, ‘ আমার ছেলেকে তারা নির্মমভাবে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে মেরেছে। তাদের গ্রেপ্তার না করতে পুলিশকে টাকা ঢালছে তারা। আমি আমার ছেলের খুনীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’ এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মাহবুব ইসলাম বলেন, ‘পিচ্ছি কামালসহ আরও তিনজন আসামি পুলিশের নজরদারিতে আছেন। পিচ্ছি কামাল ফেসবুকে সরব। তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তাকে গ্রেপ্তার করা গেলে শাহাদাত হত্যা রহস্যের জট খুলবে।’       

জানা গেছে, নিহত মো. শাহাদাত। তিনি সাতকানিয়া উপজেলার ঢেমশা ইউনিয়নের মাইজপাড়া এলাকার মৃত শফি আহমদের ছেলে। বিবাহিত শাহাদাত চার সন্তানের জনক। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনার পর উপজেলা জামায়াতের আমির কামাল উদ্দিন সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘শাহাদাত জামায়াতে ইসলামীর কর্মী। তিনি আমাদের কর্মসূচিতে সব সময় সক্রিয় ছিলেন। তাঁকে এভাবে হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।’