জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) এক শুভেচ্ছাবাণীতে বলেন, ‘ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট ‘‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’’ উপলক্ষে আমি দেশবাসী ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থানরত সকল বাংলাদেশি ভাই-বোনদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘এই দিনটি আমাদের জাতীয় জীবনের ইতিহাসে এক অনবদ্য, গৌরবময় ও অবিস্মরণীয় অধ্যায়, যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, তরুণ-তরুণী, শিশু-বৃদ্ধ, নাগরিক সমাজ ও সর্বস্তরের পেশাজীবী মানুষ অভিন্ন দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে নেমে আসেন। একপর্যায়ে ছাত্রদের এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ফ্যাসিবাদী স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতনের এক দফার আন্দোলনে পরিণত হয়। ক্ষমতা হারানোর ভয়ে উন্মত্ত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণের নির্দেশ দেন। দেশের মুক্তিকামী সর্বস্তরের মানুষ জালিম শাসকগোষ্ঠীর রক্ত চক্ষু, গুলি, বোমা উপেক্ষা করে স্বৈরশাসনের শৃঙ্খল ভেঙে বৈষম্যমুক্ত এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে দেশব্যাপী দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তোলে।
অবশেষে ২০২৪ সালের এই দিনে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব ও বীরত্বপূর্ণ গণঅভ্যুত্থানের মুখে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা তাঁর দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা ও মন্ত্রী-এমপিদের নিয়ে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। ফলে দীর্ঘ সাড়ে ১৬ বছরের একনায়কতন্ত্র, জুলুম-নির্যাতন ও ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে। দেশের মানুষ খুনি স্বৈরাচার ও তাদের বিদেশি পৃষ্ঠপোষকদের আধিপত্য থেকে মুক্তি লাভ করে। এ সবই জুলাই গণআন্দোলনের গৌরবময় ফসল।’
জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘এই আন্দোলনে জাতিকে চরম ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং রক্তমূল্য দিতে হয়েছে। পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনী ও বিজিবির একাংশের মাধ্যমে নির্বিচারে চালানো গুলিতে প্রায় দেড় হাজার মুক্তিকামী মানুষ শহীদ হন এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষ গুরুতর আহত হন। কয়েক হাজার মানুষ তাঁদের হাত, পা বা চোখ হারিয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন।’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘শহীদ আবু সাঈদ-মুগ্ধ-ওয়াসিমসহ যেসব তাজা প্রাণ বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক পেতে দিয়ে শাহাদাতবরণ করেছেন, আমি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে তাঁদের স্মরণ করছি এবং তাঁদের রূহের মাগফিরাত কামনা করছি। একইসঙ্গে আন্দোলনের সময় আহত, পঙ্গুত্ব বরণকারী, শহীদ পরিবার এবং নির্যাতিত সকলের প্রতি গভীর সমবেদনা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের মূল লক্ষ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, ইনসাফভিত্তিক এবং সুশাসন ও ন্যায়বিচারের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। তারা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এ জাতিকে এক মহৎ ঋণে আবদ্ধ করে গেছেন। আমরা তাঁদের কাছে চিরঋণী।’
তিনি আরও বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলতে হচ্ছে, একটি মহলের কারণে আমরা তাদের সেই প্রত্যাশা আজও পূরণ করতে পারিনি। এখনো আমাদের লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হচ্ছে। জাতিকে যে কোনো মূল্যে তাদের এই রক্তঋণ পরিশোধ করতে হবে। আমাদের শপথ নিতে হবে—শহীদদের এই রক্ত যেন কোনোভাবেই বৃথা না যায়। বীর শহীদদের রক্তের ঋণ আমরা কেবল তখনই আংশিক পরিশোধ করতে পারব, যখন একটি বৈষম্যহীন, পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক, সুশাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক ইনসাফপূর্ণ মানবিক বাংলাদেশ গড়তে সক্ষম হবো।’
তিনি বলেন, ‘আসুন, আজকের এই দিনে আমরা অতীতের সকল ভেদাভেদ ভুলে একটি বৈষম্যহীন, সুখী-সমৃদ্ধ, মানবিক ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার শপথ গ্রহণ করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে রক্ষা করুন এবং দেশের মানুষকে সুখে-শান্তিতে রাখুন।’