জুলাই অভ্যূত্থানের বর্ষপূর্তি নিয়ে আয়োজিত গোল টেবিল বৈঠকে বক্তারা বলেছেন, সভ্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় মানবাধিকারের চর্চা অপরিহার্য।
তারা আরও বলেছেন, জুলাই অভ্যূত্থানের সময় সংঘটিত ব্যাপক হত্যাকাণ্ডসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত ও বিচার অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত আরও গভীর হবে এবং ভবিষ্যতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি হবে।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) আয়োজিত ‘জুলাই-আগস্ট সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার: রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তারা এসব কথা বলেন।
আলোচনায় জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবারের সদস্য, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, শিক্ষক, গবেষক ও সাংবাদিকরা অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, একটি সভ্য রাষ্ট্রে মানবাধিকারের চর্চা অপরিহার্য। যে কোনো রাষ্ট্রে মানবাধিকার লঙ্ঘণের প্রবণতা থাকে। সভ্য রাষ্ট্রগুলোতেও এ প্রবণতা থাকে। এ প্রবণতা রোধ করা যায় সকলে এক হওয়ার মাধ্যমে। কিন্তু আমরা কি এক হতে হতে পেরেছি? আমাদের কি এক হওয়ার কোনো উদ্যোগ ছিল? বরং আমরা বিভিন্ন বিষয়ে বহুধা বিভক্ত হয়েছি।
তিনি বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। এক্ষেত্রে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অত্যান্ত জরুরি। না হলে রাষ্ট্র ফ্যাসিবাদ হবে। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিতদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটন বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে, যার অনেকগুলো এখনো নথিভুক্ত হয়নি। জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, গুম এবং নির্যাতনের সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, মহান একটা বিজয় এসেছে। কিন্তু কেন আমরা এটিকে দূরে ঠেলে দিচ্ছি। কেন নিজেদের মধ্যে দলাদলি করছি।’ তিনি বলেন, শেখ হাসিনাতো একা মানবাধিকার লঙ্ঘন করেননি। যারা তাকে সহযোগিতা করেছে তাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে।’
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন না হলে ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কঠিন হবে। সমালোচনা গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তোলার পাশাপাশি চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, বিচার মানে কেবল কাউকে দণ্ড দেওয়া নয়, বরং সত্য অনুসন্ধান এবং সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা। তিনি ট্রাইব্যুনালের মামলায় দ্রুত বিচারের দাবির পাশাপাশি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সারা হোসেন মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জুলাই আন্দোলনের সময় বিভিন্ন পেশাজীবীদের দায়বদ্ধতা নিরূপণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি ‘কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’র আইনি ব্যাখ্যা স্পষ্ট করা, আদালত অবমাননা আইনের অপব্যবহার রোধ এবং ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানান ব্যরিস্টার সারা হোসেন।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তানজিমউদ্দিন খান বলেন, ৫ আগস্টের পর যারা ভিন্ন মতাবলম্বী হিসেবে হামলার শিকার হচ্ছেন, তাদের অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি ‘জেনোসাইড’ বা গণহত্যার সংজ্ঞাগত ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন এবং মৃত ও আহতের সঠিক তালিকা প্রণয়নে ঐকমত্যের অভাবকে দুঃখজনক বলে অভিহিত করেন তিনি।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য ও প্রেক্ষাপট উপস্থাপন করেন এইচআএসএস’র নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম। পরে জুলাই- আগস্ট ২০২৪-এর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নিহত ও আহতদের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এইচআরএসএস’র -এর গবেষণা ও কার্যক্রম উপস্থাপন করেন সংস্থার প্রোগ্রাম অফিসার সাইফুল ইসলাম।
এসময় আরও বক্তব্য রাখেন জুলাই আন্দোলনে দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি চিরতরে হারানো সাব্বির আহমেদ, শহীদ শাহরিয়ার খান আনাস এর বাবা শাহরিয়ার খান পলাশ ও মা সানজিদা খান দীপ্তি, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রুহুল কুদ্দুস প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে জুলাই- আগস্টের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার, ভুক্তভোগীদের প্রতিকার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে এইচআরএসএস’র এর ১০ দফা সুপারিশ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান।
এইচআরএসএস’র মতে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের জন্য কার্যকর প্রতিকার, ক্ষতিপূরণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে কোনো রাষ্ট্রীয় বা অরাষ্ট্রীয় পক্ষ মানবাধিকার লঙ্ঘন করে দায়মুক্তি না পায়, সে জন্য কার্যকর জবাবদিহিতার কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে।