জুলাই জাদুঘর উদ্বোধন আজ

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে গত বছরের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এ আনুষ্ঠানিকভাবে সই করে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয়। ওই সনদের আলোকে প্রতিষ্ঠা করা হয় দুটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন ও জুলাই স্মৃতি জাদুঘর। অন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং শহীদ পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। এর মধ্যে জুলাই শহীদ স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণকাজ শেষ হয়ে আজ উদ্বোধনের অপেক্ষায়। আর জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন শুরুতে বেশ সক্রিয় থাকলেও এখন ধুঁকছে আর্থিক সংকটে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ জুলাই শহীদ স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করবেন। এ লক্ষ্যে প্রস্তুতি শেষ করেছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনের প্রায় ১৮ একর জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে এ জাদুঘর। জানা গেছে, জুলাই জাদুঘরের অভ্যন্তরে দর্শনার্থীর জন্য পাঁচটি নতুন পথ তৈরি করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের গুম-নির্যাতনের ইতিহাস, জুলাই আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতি এবং ব্যবহৃত জিনিসপত্র এখানে প্রদর্শিত হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের জব্দ করা বিভিন্ন আলামত (যেমন বুলেট, রক্তমাখা জামাকাপড় ও অস্ত্র) এক মাসের জন্য এই জাদুঘরে প্রদর্শনীর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রতীকী রয়েছে ‘আয়নাঘর’ এবং আড়াই হাজারের বেশি ডামি কবর।

গত বছরের ১৩ নভেম্বর আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর। এটি বাস্তবায়নে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং জাতীয় জাদুঘরের যৌথ তত্ত্বাবধানে এই প্রকল্পের জন্য মোট বরাদ্দ ছিল ১২৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১১০ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে এবং ১২.৫৩ কোটি টাকা কোষাগারে ফেরত দেওয়ার দাবি করেছে।  তবে প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে ব্যয় ও নিয়োগ-সংক্রান্ত অনিয়মের খবর এসেছে সংবাদমাধ্যমে। শুরুর দিকে দরপত্র ছাড়াই ১১১ কোটি ১৯ লাখ ৮১ হাজার টাকা খরচে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ উদ্বেগ জানিয়েছিল। এ ছাড়া কোনো অনুষ্ঠান না করেই জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দুই দফায় প্রধান উপদেষ্টার নামে ‘কাগজে-কলমে’ উদ্বোধন দেখিয়ে শ্রমিক মজুরি, স্টেশনারি ও আপ্যায়ন খাতের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

অফিস সরঞ্জাম ও শর্ট ফিল্মের ব্যয় ৩ কোটি ৩১ লাখ টাকার ভুয়া টেন্ডার ও অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। জাদুঘরের জন্য ১৯টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণে ‘মিনহাজ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’ নামের একটি সংস্থাকে ৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা দেওয়া হয়। ওই প্রতিষ্ঠানের চলচ্চিত্র নির্মাণের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না বলে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেন। জাদুঘরটির জন্য জনবল নিয়োগে প্রায় ১৩ হাজার আবেদন জমা পড়লেও কোনো স্থায়ী জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি নিয়ে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায়কে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ড. মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে গত ২৯ জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের নতুন মহাপরিচালক হিসেবে প্রেষণে নিয়োগ দেয় সরকার। এর আগে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব এই জাদুঘরের প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। তার বক্তব্য জানতে ল্যান্ডফোন ও মোবাইলে দুই দিন চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।

জাতীয় জাদুঘরের কিপার (জনশিক্ষা বিভাগ) আসমা ফেরদৌসি দেশ রূপান্তরকে জানান, নবনির্মিত জাদুঘরটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ জন্য ৫ আগস্ট পর্যন্ত ব্যস্ত থাকবেন তানজিম ইবনে ওয়াহাব।

এদিকে অপর প্রতিষ্ঠান জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন চরম অর্থ সংকটে ধুঁকছে। তারপরও গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন আয়োজন করছে প্রতিষ্ঠানটি। শিল্পকলা একাডেমিতে গত রবিবার আয়োজিত এমন এক অনুষ্ঠানে শহীদ জননীদের সম্মাননা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানবিষয়ক দেশাত্মবোধক গানের অডিও-ভিজ্যুয়াল উন্মোচন করা হয়েছে।  

জুলাই ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কামাল আকবর দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রতিষ্ঠানের বাড়িভাড়া এবং ৩৬ জন কর্মীর বেতন বকেয়া পড়েছে। জরুরিভিত্তিতে ১০ কোটি টাকা আর্থিক বরাদ্দ চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়ার পর অর্থ ছাড়ের একটি প্রক্রিয়া চলমান। তিনি বলেন, ‘জুলাই শহীদ পরিবার ও আহতদের ভাতা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারে দেওয়ায় এখন সেই চাপ ফাউন্ডেশনের ওপর নেই। তবে প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’

সিইও জানান, প্রথম দিকে যে আর্থিক চাহিদা নিরূপণ করা হয়েছিল, সে অনুযায়ী ৩৬৩ কোটি টাকার দরকার। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার দিয়েছে ১০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ব্যক্তি অনুদানের ২০ কোটি টাকা ফাউন্ডেশনের কাছে ছিল। ওই টাকা দিয়ে ৮৪৪ জন শহীদের পরিবারকে ৫ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ এবং আহত ১৮ হাজার ৫০০ জনের মধ্যে অঙ্গহানির শিকারসহ অন্যদের তিন ক্যাটাগরিতে যথাক্রমে ৪, ৩ ও ২ লাখ টাকা করে এককালীন বরাদ্দ দিয়েছে ফাউন্ডেশন। এ ছাড়া ১৫০টি পরিবারকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।    

কামাল আকবর বলেন, ‘এক বছরের বরাদ্দ টাকা দিয়ে গত দুই বছর চালিয়েছে ফাউন্ডেশন। অথচ জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যে আহতরা হঠাৎ করে হটলাইনে ফোন করে সহায়তা চান। তাদের কারও অ্যাম্বুলেন্স দরকার, কারও ওষুধ অথবা কারও নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। এ সবই করতে হচ্ছে ফাউন্ডেশনকে।’  

জুলাই ফাউন্ডেশন সমাজসেবা অধিদপ্তরে নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠান। ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর এই ফাউন্ডেশন নিবন্ধিত হয়। শুরুর দিকে জুলাই ফাউন্ডেশন ব্যক্তি অনুদানে ব্যাপক সাড়া পেলেও এখন তেমন নেই বলে জানান সিইও কামাল আকবর। তিনি বলেন, ‘এখনও অনুদান আসে। তবে আগের মতো নয়, স্লো।’

এদিকে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের কর্মকাণ্ড ঘিরেও কিছু অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আহত ও শহীদ পরিবারের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ এবং আন্দোলনের ঘটনাও ঘটেছে। দীর্ঘ সময় ধরে আর্থিক ও চিকিৎসা সহায়তা না পেয়ে আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা ফাউন্ডেশনের অফিসে কয়েক দফা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটান। এ ছাড়া শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যরা মানববন্ধন করে ফাউন্ডেশনের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়িত্বহীনতার অভিযোগ তুলে অপসারণ চেয়েছেন। ভুয়া ‘জুলাই যোদ্ধা’ শনাক্তকরণের নামে জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধরের অভিযোগও এসেছে বিভিন্ন সময়ে। জিজ্ঞাসাবাদের নামে স্ত্রীসহ জুলাই যোদ্ধা বুলবুল শিকদারকে মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের ১৩ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আদালতের নির্দেশে এ মামলা তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।