মূলধন ঘাটতির কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের চারটি শাখা বন্ধ (উইন্ডিং-ডাউন) করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক চিঠি গত ১৫ জুলাই জনতা ব্যাংককে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের দ্রুত হস্তক্ষেপ চেয়ে চিঠি দিয়েছে জনতা ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষ।
মূলধনের পরিমাণ-সংক্রান্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধিমালার শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দেশটিতে জনতা ব্যাংকের শাখাগুলো বন্ধ হয়ে গেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুন্ন হবে। সেই সঙ্গে বিদেশে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
জনতা ব্যাংকের নিজস্ব এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধিমালা অনুযায়ী সেখানে জনতা ব্যাংকের চারটি শাখা পরিচালনার জন্য ন্যূনতম ৪০০ মিলিয়ন দিরহাম মূলধন প্রয়োজন। বর্তমানে দেশটিতে জনতা ব্যাংকের মূলধন রয়েছে প্রায় ১০০ মিলিয়ন দিরহাম। এই বিপুল ঘাটতির কারণে চারটি শাখা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ঘাটতির বিষয়ে গত ২২ এপ্রিল জনতা ব্যাংককে অবহিত করা হয়েছিল। তবে এর তিন মাস পরও কোনো সুরাহা না হওয়ায় শাখা বন্ধ করে দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।
সূত্র জানায়, এক সময়ে ভালো ব্যাংকের তালিকায় শক্ত অবস্থানে থাকা জনতা ব্যাংক বিগত প্রায় দুই দশকে ঋণ জালিয়াতির কারণে বিপুল তারল্য সংকটে ভুগছে। এ কারণেই প্রতিষ্ঠানটি আরব আমিরাতে প্রয়োজনীয় মূলধন জোগান দিতে পারছে না। অথচ এই চার শাখার মাধ্যমে প্রতি বছর ব্যাংকটি প্রায় ৮০ কোটি টাকা মুনাফা করছে। তারল্য সংকটের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত বৃহৎ ব্যাংকটির শাখা আরব আমিরাত থেকে গুটিয়ে নিতে হলে অন্য দেশগুলোতেও তাদের ব্যবসা হুমকিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে বিদেশে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত নিয়ে নেতিবাচক ধারণা আরও জোরদার হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহ-উপাচার্য অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়, এটি দেশের ভাবমূর্তিরও অংশ। বিদেশে রাষ্ট্রায়ত্ত কোনো ব্যাংকের কার্যক্রম সংকুচিত হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে। তাই সমস্যার সাময়িক সমাধানের পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।’
জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উত্থাপিত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিজেই বিষয়টির তদারক করছেন। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে গ্রহণযোগ্য সমাধানের চেষ্টা চলছে। আরব আমিরাত কর্র্তৃপক্ষের কাছে মূলধন ঘাটতি পূরণের জন্য অতিরিক্ত সময় চাওয়া হয়েছে। আশা করছি, আলোচনার মাধ্যমে কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে একটি ইতিবাচক সমাধান আসবে।’
তিনি বলেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাতে জনতা ব্যাংকের চারটি শাখা বন্ধ হয়ে গেলে এর প্রভাব শুধু ব্যাংকের কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই শাখাগুলোর মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি নিয়মিত দেশে অর্থ পাঠান। শাখাগুলো বন্ধ হলে রেমিট্যান্স আহরণে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে।’
মজিবুর রহমান বলেন, ‘জনতা ব্যাংক বিদেশে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক বা ন্যাশনাল ফ্ল্যাগ ক্যারিয়ার হিসেবে কাজ করছে। তাই এসব শাখা বন্ধ হয়ে গেলে প্রবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ব্যাংকিং খাতের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
তিনি জানান, আরব আমিরাতে কর্মরত বাংলাদেশি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ধরনের ব্যাংকিং সেবা নিতে জনতা ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। শাখাগুলো বন্ধ হয়ে গেলে তাদের ব্যবসায়িক লেনদেন, আমদানি-রপ্তানি সংশ্লিষ্ট অর্থ পরিশোধ, ব্যাংক গ্যারান্টি ও অন্যান্য ব্যাংকিং কার্যক্রম ব্যাহত হবে। এতে প্রবাসী ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ ও আরব আমিরাতের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। আরব আমিরাতে জনতা ব্যাংকের কার্যক্রম যাতে আকস্মিকভাবে বন্ধ না হয়, সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে এবং গ্রহণযোগ্য সমাধানের চেষ্টা চলছে।’
অর্থনীতি বিশ্লেষক ও গবেষক হেলাল আহমেদ খান জনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মূলধন ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে জনতা ব্যাংককে সহায়তা দেওয়া হবে কিনা, তা অনেকটাই সরকারের সদিচ্ছা ও নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সময় চাওয়ার ঘটনায় ধারণা করা যায়, সরকার ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংক থেকে সরকার ও দেশের অর্থনীতি কতটা বাস্তব সুবিধা পাচ্ছে, সেটিও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।’
ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল সুশাসন ও লুটপাটের কারণে সাধারণ মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শুধু মূলধন সহায়তা দিয়ে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। সুশাসন, জবাবদিহি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।’
১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত জনতা ব্যাংক দেশের অন্যতম বড় রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৯৭৪ সালে কার্যক্রম শুরু করে বর্তমানে আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ ও আল-আইনে চারটি পূর্ণাঙ্গ শাখা এবং আবুধাবিতে একটি প্রধান নির্বাহী কার্যালয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি সেবা দিচ্ছে।
বর্তমানে আরব আমিরাতে প্রায় ১০ লাখ রেমিট্যান্স-সংশ্লিষ্ট গ্রাহক, প্রায় ৭০ হাজার আমানত হিসাবধারী এবং প্রায় ৩ হাজার ৮০০ ঋণগ্রহীতাকে সেবা দিচ্ছে জনতা ব্যাংক। বাংলাদেশ থেকে প্রেষণে নিয়োজিত ২০ জন এবং স্থানীয়ভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ৭৫ জনসহ মোট ৯৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী সেখানে কাজ করছেন। ব্যাংকটি রেমিট্যান্স, ঋণ, বৈদেশিক ব্যাংক গ্যারান্টি, ডলার বিনিয়োগ ও প্রিমিয়াম বন্ড বিক্রিসহ বিভিন্ন সেবা দিচ্ছে। গত ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে ইউএই কার্যক্রমে আমানত, ঋণ বিতরণ ও রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।