শ্রাবণের মেঘলা বিকেল। আকাশজুড়ে টানা বর্ষণ। বৃষ্টি উপেক্ষা করেই রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জড়ো হন হাজারো তরুণ। সেখানে ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিজয় দিবস উপলক্ষে গতকাল বুধবার অনুষ্ঠিত হয় ‘বর্ষা বিপ্লবের গান’ শিরোনামের ওপেন এয়ার কনসার্ট। মুনসুন কালচারাল অ্যালায়েন্সের আয়োজনে এই কনসার্ট একদিকে যেমন জুলাইয়ের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে, তেমনি সংগীতের সুরে উদযাপিত হয়েছে গণঅভ্যুত্থানের বিজয়ের স্মৃতি।
বিকেল ৩টায় কনসার্ট শুরু হওয়ার কথা থাকলেও দুপুর আড়াইটার পর শুরু হওয়া অঝোর বৃষ্টির কারণে তা পিছিয়ে যায়। তবে বৈরী আবহাওয়া দর্শকদের উৎসাহে ভাটা ফেলতে পারেনি। বৃষ্টি থামার পর বিকেল সাড়ে ৪টায় শুরু হয় অনুষ্ঠান। সুর, কণ্ঠ আর দর্শকদের সম্মিলিত উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ।
কনসার্টের সূচনা করে ব্যান্ড নীল। উদ্বোধনী পরিবেশনায় তারা শোনায় ‘চেনা শহর’ ও ‘কোন দিক’। এরপর মঞ্চে ওঠে নাহিদ অ্যান্ড মিউজিশিয়ান। তাদের কণ্ঠে ভেসে আসে ‘তোমার পিছু ছাড়ব না’ এবং ‘৩৬ জুলাই’। পরে র্যাপার জে কে তাহমিদ পরিবেশন করেন ‘বয়ান’ ও ‘সব শালারা চোর’। পারশা মাহজাবীন গেয়ে শোনান ‘বসন্ত বাতাসে সই গো’, ‘আমি যারে বাসি ভালো, কাজলের চেয়ে কালো’ এবং ‘বকুল ফুল’।
কনসার্টে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, বিরোধী দলের চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন এবং সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ উৎসর্গকারীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই নতুন বাংলাদেশ গঠনের পথ তৈরি হয়েছে।’ তিনি জুলাই বিপ্লবের শহীদ এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নিহত ও গুমের শিকার ব্যক্তিদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ‘আধিপত্যবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে নতুন করে শপথ নেওয়ার সময় এসেছে। দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে নিতে হবে।’
নুরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে, সেখান থেকে আমরা কখনো বিচ্যুত হব না। আমরা শপথ করছি, বাংলাদেশে আর যেন কোনো স্বৈরাচারের উত্থান না ঘটে, রাষ্ট্রের সম্পদ লুণ্ঠিত না হয় এবং তরুণদের স্বপ্ন কেউ পদদলিত করতে না পারে। জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে দেশকে এগিয়ে নিতে এবং দেশের সম্পদ রক্ষায় আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকব।’
বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ মুগ্ধ, শহীদ ওয়াসিমসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সব শহীদ এবং আহত যোদ্ধাদের প্রতি আমরা গভীর শ্রদ্ধা জানাই। ইনশাআল্লাহ, তাদের আত্মত্যাগের প্রেরণায় আমরা একটি বৈষম্যহীন, কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাই শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের, যারা ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার পক্ষে রাজপথে নেমে এসেছিলেন।’
আখতার হোসেন বলেন, ‘৩৬ জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করেই আজকের এই বিজয় উদযাপনে তরুণরা এখানে একত্রিত হয়েছে। নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখিয়েও তাদের দমিয়ে রাখা যায়নি। তারা শুধু গান শুনতে আসেনি, বরং জুলাইয়ের বিজয়কে উদযাপন করতে এসেছে। আমরা বিশ্বাস করি, জুলাইকে ভুলিয়ে দেওয়ার বা এর গুরুত্ব খাটো করার যেকোনো চেষ্টা ব্যর্থ হবে। আগামী দিনেও তারুণ্য জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করেই তাদের পথচলা নির্ধারণ করবে।’
এদিন কনসার্টে অ্যাভয়েড রাফা পরিবেশন করে ‘আমার হার কালা করলাম রে’, ‘চলো আরেকবার উড়ি’ ও ‘আমি আকাশ পাঠাবো’। আর্বোভাইরাস গেয়ে শোনায় ‘আয় আয় বন্ধুরা ফিরে আয়’, ‘হারিয়ে যাও’, ‘জ্বালো আগুন জ্বালো’সহ তাদের জনপ্রিয় কয়েকটি গান। কুঁড়েঘর পরিবেশন করে ‘আমার হৃদয় পিঞ্জিরার পোষা পাখি’সহ কয়েকটি গান। শিল্পীদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে দর্শক-শ্রোতারাও যেন স্মরণ করেন জুলাইয়ের দ্রোহ, ত্যাগ ও বিজয়ের ইতিহাস। বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় সংগীত তাই হয়ে ওঠে স্মৃতি, প্রতিবাদ এবং নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নের এক সম্মিলিত ভাষা।
‘বর্ষা বিপ্লবের গান’ আয়োজন বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আমাদের সবাইকে শপথ নিতে হবে, আমরা একটি পরিবর্তিত বাংলাদেশ গড়ে তুলব, যেখানে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।’