দিক পরিবর্তন করে ডান তীরে সরে আসায় তিস্তা নদীর পানি বাড়তে শুরু করলেই ভরাডুবি ঘটে তিনটি গ্রামে। গ্রাম তিনটি হলো নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের ছাতুনামা, কেল্লাপাড়া ও ভেন্ডাবাড়ি। গতকাল বুধবার ভোর থেকে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়ে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ডালিয়া পয়েন্টে (খালিশাচাপানি বাইশপুকুর) বিপদসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলে ওই তিন গ্রামের ফসলি জমি, ঘরবাড়ি, পথঘাট তলিয়ে যায়। ইতিপূর্বে ওই তিন গ্রামে শতাধিক বসতঘর বিলীন হয়েছে, অসংখ্য ফসলি জমি নদীর গর্ভে তলিয়ে গেছে। নদীভাঙন প্রতিরোধে সেখানে বিক্ষিপ্তভাবে ফেলা হচ্ছে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব।
ভারী বর্ষণে ১৪ দিনের ব্যবধানে আবারও গর্জে উঠেছে তিস্তা। টানা বৃষ্টি আর উজানের ঢলে তিস্তা বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। এতে ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার অন্তত ১৫টি চর ও নিম্নাঞ্চলীয় গ্রাম প্লাবিত হয়। তবে গতকাল বিকেলে তিস্তার পানি কমে বিপদসীমার দুই সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। জানা গেছে, পানির প্রবাহ ঠিক রাখতে দেশের সর্ববৃহৎ তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। গতকাল রাতে আরও পানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
পাউবো ডালিয়া ডিভিশন জানায়, তিস্তা অববাহিকায় গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বৃষ্টিপাতও অব্যাহত ছিল। এ ছাড়া অতিভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে গতকাল বুধবার সকাল ৬টা ও ৯টায় নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানির উচ্চতা ছিল ৫২ দশমিক ২৮ মিটার। এ পয়েন্টে বিপদসীমা ৫২ দশমিক ১৫ মিটার। অর্থাৎ নদীর পানি বিপদসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগে গত মঙ্গলবার বিকাল ৬টায় নদীর পানি ছিল বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচে। মাত্র ৯ ঘণ্টার ব্যবধানে পানি ২৮ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমা অতিক্রম করে। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে নদীর পানি কমতে শুরু করলে বিকেল ৬টায় নদীর পানি কমে বিপদসীমার দুই সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
পাউবো ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় বাংলাদেশ অংশে টানা বৃষ্টিপাতের কারণেই তিস্তার পানি বেড়ে গতকাল সকালে বিপদসীমা অতিক্রম করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে।
ঝুনাগাছ চাপানী ইউপি চেয়ারম্যান একরামুল হক চৌধুরী বলেন, তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়ে নতুন করে নিম্নাঞ্চলে প্রবেশ করায় কেল্লাপাড়া, ছাতুনামা, ভেন্ডাবাড়ি গ্রামের বিভিন্ন বসতভিটায় পানি প্রবেশ করেছে। এর আগে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ওই তিন গ্রামের শতাধিক ফসলি জমি ও আমনের চারা তলিয়ে যায়। পানি কমার পর তারা আবারও আমনের চারা রোপণ করতে শুরু করেছিল, কিন্তু গতকাল সকালে পানি আবারও বৃদ্ধি পেয়ে সেই জমিগুলো পুনরায় তলিয়ে গেছে।
কেল্লাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রশিদুল ইসলাম বলেন, তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে ঝুনাগাছ চাপানীর কেল্লাপাড়া, ছাতুনামা ও ভেন্ডাবাড়ি গ্রাম প্লাবিত হয়। কিছুদিন আগে দিক পরিবর্তন করে ডান তীরে সরে আসায় এই তিনটি গ্রামে নদীভাঙন শুরু হয়। এভাবে চলতে থাকলে নদীভাঙন ঠেকাতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউবের বাঁধ টিকবে কি না, সেই দুশ্চিন্তায় আছি।
তিস্তা তীরবর্তী মানুষের ভাষ্যমতে, বর্ষা এলেই তাদের জীবন যেন অনিশ্চয়তার আরেক নাম হয়ে ওঠে। নদীর পানি বাড়লেই ওই তিন গ্রামে প্রথমে তলিয়ে যায় কৃষিজমি, এরপর প্লাবিত হয় গ্রাম। অনেক পরিবারকে গবাদি পশু, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে হয়। পানি নেমে গেলেও শেষ হয় না দুর্ভোগ।
তাই প্রতি বর্ষায় একই প্রশ্ন ফিরে আসে তিস্তার পানি বাড়লেই নিম্নাঞ্চলের মানুষের এই অন্তহীন কষ্টের স্থায়ী সমাধান কবে হবে?