দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও শিবিরের সংঘর্ষ, আহত ৩০

নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় সরকারি তোলারাম কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে উভয়পক্ষের ১০ আহত হয়েছে। গতকাল বুধবার দুপুরে কলেজ ক্যাম্পাসে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটে। এদিন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের মধ্যে দুই দফা সংঘর্ষ হয়েছে। এতে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছে। ঘটনার জন্য সংগঠন দুটি পরস্পরকে দায়ী করেছে।

নারায়ণগঞ্জ : প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজ ক্যাম্পাসে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে উভয়পক্ষের মধ্যে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে রড, লাঠিসোটা, ইটপাটকেল নিক্ষেপে সংঘর্ষ বেধে যায়। খবর পেয়ে ছাত্রশিবিরের জেলা ও মহানগরের নেতাকর্মীরা চাষাঢ়া ডাকবাংলোর সামনে লাঠিসোটা নিয়ে অবস্থান নেয়। অপরদিকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা কলেজের সামনে অবস্থান নেয়। পরে ফের কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়।

পুলিশের একাধিক টিম ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং উভয়পক্ষকে বুঝিয়ে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দেয়। এরপর ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা কলেজ ক্যাম্পাস থেকে চলে গেলেও ছাত্রদলের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা কলেজ ক্যাম্পাসে জড়ো হয়। এরপর তারা বিক্ষোভ মিছিল বের করে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এ সময় তারা ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে নানা ধরনের সেøাগান দেয়।

আহতদের নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল ও ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। ছাত্রশিবিরের আহতরা হলেন তোলারাম কলেজ ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইমদাদুল হক শুভ, সেক্রেটারি তামিম ও অর্থ সম্পাদক জুহাস, মহানগর সভাপতি অমিত হাসান ও অর্থ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম। ছাত্রদল কর্মী তুহিন আহমেদ আহত হয়েছে বলে জানা গেছে। আর বাকিদের নাম জানা যায়নি।

তোলারাম কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি মনির হোসেন জিয়া বলেন, ‘তোলারাম কলেজে ৫ আগস্ট উপলক্ষে আলোচনা সভা ছিল। ছাত্রশিবির এখানে উচ্ছৃঙ্খল বক্তব্য দেয়। আমরা তাদের বলেছি এখানে উচ্ছৃঙ্খল বক্তব্য দেওয়া যাবে না। এই ক্যাম্পাসে সহাবস্থান ছিল এবং সহাবস্থান আছে। তারা আমাদের কয়েকজনকে মেরে আহত করেছে।’

নারায়ণগঞ্জ মহানগর ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি অমিত হাসান বলেন, আমরা মহানগর ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে জুলাই নিয়ে আমাদের কার্যালয়ে প্রোগ্রাম করছিলাম। এই সময়ে আমরা খবর পেলাম, আমাদের তোলারাম কলেজ সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও অর্থ সম্পাদককে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা মারধর করেছে। এই খবর পেয়ে তাদের উদ্ধার করতে এলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আমাদের ওপর হামলা করে। আমাদের প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন আহত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ছাত্রদল পরিকল্পিতভাবে ক্যাম্পাস দখল করার জন্য ঝামেলা করছে। ছাত্রশিবিরের কারণে তারা টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি করতে পারছে না। এ জন্য তারা শিবিরের ওপর হামলা করেছে।

সরকারি তোলারাম কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠান ছিল। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর শুনলাম গেটের বাইরে একজন আহত হয়েছে। ছাত্রদল এবং ছাত্রশিবিরের মধ্যে এ ঘটনা ঘটেছে বলে জানতে পেরেছি। প্রশাসনকে জানানোর পর তারা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) হাসানুজ্জামান জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ঘটনার সিসি ক্যামেরা ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বরিশাল : বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গতকাল সকাল ১০টার দিকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’-এর কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দুই দফা সংঘর্ষ হয়েছে। এতে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছে। ঘটনার জন্য সংগঠন দুটি পরস্পরকে দায়ী করেছে।

আহতদের মধ্যে ১০ জনকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তারা হলেন সাফওয়ান, শিফাত, আল আমিন, হেলাল, রবিউল, মনিরুল ইসলাম, হাফিজ, আব্দুল্লাহ আল বাকি, হৃদয়  ও তরিকুল ইসলাম।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম আজমাইন অভিযোগ করে বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে ক্যাম্পাসে আমাদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ চলছিল। তখন ছাত্রশিবির বহিরাগতদের নিয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে। আমরা বাধা দিলে তারা লাঠি ও রড দিয়ে হামলা চালায়। এতে ছাত্রদলের ১০ থেকে ১১ জন নেতাকর্মী আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।’

অন্যদিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছাত্রশিবিরের কর্মী (সাথী) মো. আল আমিন পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, ‘চব্বিশের শহীদদের স্মরণে আমাদের একটি সাধারণ মিছিল ছিল। মিছিলের শেষ মুহূর্তে ছাত্রদল হঠাৎ হামলা চালায়। এ নিয়ে দীর্ঘক্ষণ ধাক্কাধাক্কি ও কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ভিসি ও প্রক্টরসহ শিক্ষকরা এসে থামানোর চেষ্টা করলে পেছন থেকে শাখা শিবিরের সভাপতি মনিরুল ইসলামকে আঘাত করা হয়। তাকে রক্ষা করতে গেলে আমাকেও মারধর করা হয়।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মেহেদি হাসান সোহাগ বলেন, “দুই পক্ষের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি থেকে একে অপরকে ‘হিট’ (আঘাত) করেছে। আমরা উভয়পক্ষকে থামিয়েছি, আর পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে আমরাও আহত হয়েছি।”

ঘটনাস্থলে উপস্থিত মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার বেলাল হোসাইন জানান, ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে মারামারির খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে যায়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। বর্তমানে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।

শিক্ষাঙ্গনে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা প্রতিহত করা হবে : ছাত্রদল

ছাত্রশিবির সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দামের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতার প্রকাশ্য উসকানি বলে মন্তব্য করেছেন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির। গতকাল বুধবার সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে এ মন্তব্য করেন তিনি।

পোস্টে নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, ছাত্রশিবির সভাপতির ‘আমরা প্রতিরোধ করলে ছাত্রদল ১০ মিনিটও ক্যাম্পাসে থাকতে পারবে না’  এ ধরনের বক্তব্য শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতার প্রকাশ্য উসকানি। যারা ফ্যাসিবাদী শাসনের পুরো সময় আন্ডারগ্রাউন্ডে কাটিয়েছে, নিজেদের সংগঠন নিষ্ক্রিয় রেখে প্রকাশ্যে ছাত্রলীগের ছত্রছায়ায় মিশে থেকে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে, তাদের মুখে শক্তির আস্ফালন অত্যন্ত হাস্যকর। এখনো তাদের একটি অংশকে আন্ডারগ্রাউন্ডে রেখে অপর অংশকে সংঘাত সৃষ্টির কাজে নামানো হয়েছে। এটি শিক্ষাঙ্গনকে অস্থিতিশীল করার পুরনো কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি।

ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক অভিযোগ করে বলেন, ঢাকা থেকে উসকানি দিয়ে রাজশাহী, রংপুর, চট্টগ্রামের ক্যাম্পাসগুলোতে সন্ত্রাসী মহড়া ও ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে বিকৃত উল্লাস করেছেন আপনারা। কিন্তু শিক্ষার্থীরা আপনাদের প্রতিরোধ করতে শুরু করেছে। এখন আর ছাড় দিচ্ছে না। ১০ মিনিট নয়, ১০ বছরও নয়, আপনার মতো আরও ১০-২০ জন সভাপতির মেয়াদ পূর্ণ করেও কিছুই করতে পারবেন না। ছাত্রদল স্পষ্টভাবে বলতে চায়, আমরা সংঘাতে নয়, শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাস করি। কিন্তু শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, হুমকি কিংবা উসকানির মাধ্যমে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার যেকোনো অপচেষ্টা শিক্ষার্থীরাই ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করবে।

ছাত্রদলকে নিয়ন্ত্রণ না করলে পরিণতি হবে ভয়াবহ : ছাত্রশিবির

ছাত্রদল যেভাবে শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস শুরু করেছে, তা অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে এই সরকারের পরিণতি আওয়ামী লীগের চেয়েও ভয়াবহ হবে বলে হুঁশিয়ার করেছে ইসলামী ছাত্রশিবির। গতকাল বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, সব গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করা এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলের হামলার প্রতিবাদে ছাত্র গণজমায়েতে তারা এ হুঁশিয়ারি দেন।

সমাবেশে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, গত মঙ্গলবার ক্যাম্পাসগুলোতে যারা হামলা করেছে, তারা প্রকৃত ছাত্র নয়, বরং সন্ত্রাসী ও টোকাই। ছাত্রদল ক্যাম্পাসগুলোতে যাদের দিয়ে কমিটি দিয়েছে, তাদের অনেকের ছাত্রজীবন ১৫ থেকে ২০ বছর আগে শেষ হয়েছে। ‘আদুভাই’ দিয়ে ক্যাম্পাসের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। পূর্বের ফ্যাসিবাদী বন্দোবস্ত ফিরিয়ে আনতে তারা ক্যাম্পাসগুলোতে আবার হল দখল, গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে চায়। তিনি বলেন, প্রতিটি ক্যাম্পাসে সহাবস্থান চলবে। এরপর কোনো ক্যাম্পাসে রক্ত ঝরলে এর দায়ভার সরকারকে নিতে হবে।

ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহর সঞ্চালনায় ছাত্র গণজমায়েতে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি হামিদুর রহমান আযাদ, রফিকুল ইসলাম খান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ প্রমুখ।