জননিরাপত্তা

আইনশৃঙ্খলায় মনোযোগ বাড়ান

জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেকোনো কল্যাণমুখী ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত। একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং নাগরিকদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখার জন্য সুদৃঢ় আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। আমরা দেখছি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিংবা জননিরাপত্তার মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ৬ আগস্ট দেশ রূপান্তরে ‘অপরাধের ধরন বদলেছে নিরাপত্তা উদ্বেগ কাটেনি’ শিরোনামে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। চাঁদাবাজি, দখলবাজি, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই প্রভৃতি অপরাধ নিয়মিতই ঘটছে। অপরাধ, দুর্বৃত্তপনা ও সহিংসতা চলমান।’ আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, প্রায় তিন দশকের আওয়ামী লীগের শাসনামলে আইনশৃঙ্খলা-মানবাধিকার পরিস্থিতি জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার পারদ কতটা ঊর্ধ্বমুখী করেছিল। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে এই পারদ আরও ঊর্ধ্বমুখী হয়, ‘মব’সহ নানামাত্রিক দুর্বৃত্তপনায় ।

আমাদের স্মরণে আছে, সরকারের কোনো কোনো নীতিনির্ধারক  শুরুতেই বলেছিলেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন কিংবা জননিরাপত্তায় সবার আগে জোর দেওয়া হবে। অসত্য নয় যে, অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলের ‘মব’ কিংবা ‘গণ-সহিংসতা’র উৎকট মাত্রার ছায়া অনেকটা সরেছে বটে, কিন্তু একই সঙ্গে এও সত্য, জননিরাপত্তা-বিষয়ক উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি; ভয়ের অপসংস্কৃতি তাড়া করছে এখনও। তুচ্ছ ঘটনায় বড় সহিংসতা হচ্ছে এবং এর বাইরে থাকছে না গ্রামাঞ্চলও। শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তির মধ্যে এরই মাঝে দফায় দফায় সংঘাত-সংঘর্ষে রক্ত ঝরেছে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়সহ অন্য কয়েকটি বিশ^বিদ্যালয় ও কলেজে বিরাজ করছে উত্তপ্ত পরিস্থিতি। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা বলেছি, সরকারি দলসহ কোনো রাজনৈতিক পক্ষই এর দায় এড়াতে পারে না। আমরা কোনোভাবেই চাই না, শিক্ষাঙ্গনে ফের সেই অপছায়া বিস্তৃত হোক। নারী ও শিশুর ওপর পৈশাচিক ঘটনার পুনরাবৃত্তিও কাম্য ছিল না। বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি এবং সামাজিক অসহিষ্ণুতার মতো অশুভ প্রবণতার নিরসন ঘটবে, তাও ছিল প্রত্যাশিত। রাজনৈতিক তো বটেই, সামাজিক প্রেক্ষাপটেও সংঘাত, খুনসহ বহুবিধ দুষ্কর্মের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটছেই।

আমরা মনে করি, অপরাধের ধরনের নিরিখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে বিশেষ করে পুলিশি তৎপরতার কৌশল নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে অপরাধী যেই হোক তার বিরুদ্ধে কঠোর ও নির্মোহ রাজনৈতিক অবস্থান নিতে হবে। পুলিশের মানসিক মনোবল ও পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা দরকার। এর পাশাপাশি তাদের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। ঘটনা বা মামলার তদন্ত কার্যক্রমে আনতে হবে গতিশীলতা। দ্রুত ও ন্যায়বিচারের পথ করতে হবে মসৃণ। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে সমাজবিরোধীরাও তাদের অবস্থান পাল্টায়, এও আমাদের সঞ্চিত তিক্ত অভিজ্ঞতা। ১৯২৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট কেলভিন কুলিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রথমেই বলেছিলেন, ‘মানুষের জীবনের নিরাপত্তা রক্ষার চেয়ে বড় কিছুই নেই’। তার এই বক্তব্যের প্রতিফলন যুগে যুগে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সমাজে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। বর্তমানে সমাজে অপরাধ বৃদ্ধির মতো উদ্বেগজনক পরিস্থিতি জিইয়ে থাকা অনেকটা অপ্রত্যাশিত। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে যখন রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করে, তখন অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এর যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে।   

আমরা এও জানি, গণঅভ্যুত্থানের সময় থানা থেকে লুণ্ঠিত অনেক আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আমরা মনে করি, দেশজুড়ে  আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, লুণ্ঠিত অস্ত্রসহ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা জরুরি। আমরা আরও মনে করি, বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে কোনো প্রতিপক্ষ সক্রিয় রয়েছে কিনা, এর অনুসন্ধানও দরকার। যেকোনো মূল্যে সবার আগে জননিরাপত্তায় গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, রাজনীতিকরা যদি জনকল্যাণ ও গঠনমূলক রাজনীতিচর্চার পথ সুগম করে সুস্থ চিন্তা ও অনুশীলনের রাস্তা বের করে দিতে পারেন, তাহলে সমাজে এর ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হতে বাধ্য। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করায় সরকারের দায়িত্বশীল সব পক্ষের যূথবদ্ধ প্রয়াসের বিকল্প নেই। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিকল্পে সরকারকে মনোযোগ আরও গভীর করতেই হবে।