জুয়া শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা বা নৈতিক অবক্ষয় নয়। এটি গুরুতর অর্থনৈতিক সংকটের নাম। এই জুয়া এমন নেশায় পরিণত হয়েছে যা মানুষের অর্থ, শ্রম ও ভবিষ্যৎকে গ্রাস করছে। এর প্রভাব শুধু একটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তার অভিঘাত পড়ে জাতীয় অর্থনীতির ওপর। অর্থনীতির মূল ভিত্তি উৎপাদন, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ। কিন্তু অনলাইন জুয়া এই তিন ভিত্তিকে দুর্বল করে। একজন ব্যক্তি যখন উপার্জিত অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় না করে, অনলাইন বেটিং বা জুয়ায় ঢেলে দেন তখন সেই অর্থ অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবাহ থেকে বিচ্যুত হয়। যে অর্থ ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে বিনিয়োগ হতে পারত, তখন তা চলে যায় অবৈধ প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণে। এতে ব্যক্তি যেমন নিঃস্ব হন, তেমনি দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনলাইন জুয়ার আরেকটি বড় বিপদ হলো অর্থ পাচার। অধিকাংশ জুয়ার প্ল্যাটফর্ম দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত হয়। ব্যবহারকারীদের জমা দেওয়া অর্থ, নানা ডিজিটাল মাধ্যম ঘুরে বিদেশে চলে যায়। ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ার ফলে বৈধ আর্থিক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকার যে অর্থ থেকে কর আদায় করতে পারত, সেই অর্থের বড় অংশ করের আওতার বাইরে থাকে। অর্থাৎ অনলাইন জুয়া শুধু ব্যক্তির সঞ্চয় নষ্ট করে না, রাষ্ট্রের রাজস্ব আয়কেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। পাশাপাশি উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টার অপচয়ও একটি বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি। অনেক কর্মজীবী অফিসের সময় কিংবা ব্যবসার ফাঁকে, অনলাইন জুয়ায় সময় ব্যয় করেন। এতে কর্মদক্ষতা কমে, উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায় এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি হয়। একজন কর্মীর অনিয়মিত আচরণ, শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিবেশ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
জুয়ার সামাজিক মূল্য কম নয়। ব্যক্তি যখন ধারদেনায় জর্জরিত হন তখন পরিবারের শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন ব্যয় সংকুচিত হয়ে পড়ে। অনেক পরিবার সঞ্চয় ভেঙে ফেলে, সম্পদ বিক্রি করে কিংবা ঋণের ফাঁদে আটকে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি দারিদ্র্য বাড়ায় এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলা যায়, অনুৎপাদনশীল ব্যয়। যা ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয়ের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনলাইন জুয়া দ্রুত ধনী হওয়ার বিভ্রম সৃষ্টি করে। এতে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতার পরিবর্তে, ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ে। একটি জাতির তরুণ গোষ্ঠী যদি উৎপাদনশীল কাজের পরিবর্তে অর্থ পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়, তবে তা মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্যও অশনিসংকেত। অর্থনীতির শক্তি নির্ভর করে দক্ষ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ওপর ভাগ্যনির্ভর মানসিকতার ওপর নয়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত কৌশল জরুরি। অবৈধ লেনদেন শনাক্তে ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত ওয়েবসাইট, অ্যাপ এবং অর্থ লেনদেনের নেটওয়ার্ক দ্রুত বন্ধ করতে হবে। অনলাইন জুয়া কোনো বিনিয়োগ নয়, আয়ের উৎস নয় এটি সম্পদ ধ্বংসের সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া।
কোনো দেশের অর্থনীতি তখন শক্তিশালী হয়, যখন মানুষের উপার্জন উৎপাদন- সঞ্চয় ও বিনিয়োগে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সেই অর্থ যদি অনলাইন জুয়ার অন্ধকার গহ্বরে হারিয়ে যায়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র। ফলে অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে লড়াই শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি আর্থিক নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত।
অনলাইন জুয়ার বিস্তার দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অর্জনকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। মোবাইল ব্যাংকিং, ডিজিটাল ওয়ালেট এবং অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থা মূলত মানুষের জীবনকে সহজ করা, সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং বৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করার জন্য চালু হয়েছে। কিন্তু অপরাধচক্র যখন এই প্রযুক্তিকে অবৈধ জুয়ার লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ক্ষুণœ হয়। এতে একদিকে আর্থিক খাতে প্রতারণার ঝুঁকি বাড়ে, অন্যদিকে সরকারের ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ার উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশ অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে অবৈধ লেনদেন শনাক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশকেও এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
শুধু আইন কঠোর করলেই হবে না; আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিটিআরসি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মোবাইল অপারেটর এবং মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং গণমাধ্যমকে তরুণদের মধ্যে আর্থিক সচেতনতা, সঞ্চয়ের সংস্কৃতি এবং পরিশ্রমনির্ভর সফলতার মূল্যবোধ গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। একটি জাতির প্রকৃত সম্পদ তার অর্থ নয় সচেতন, দক্ষ ও নৈতিক নাগরিক সমাজ। সেই সম্পদকে রক্ষা করতে পারলে, অনলাইন জুয়ার মতো অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয় থেকে দেশকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
লেখক : ব্যাংক কর্মকর্তা ও সহযোগী অ্যধাপক
সাউথ ইস্ট বিশ^বিদ্যালয়।liplisa7@gmail.com