যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত আর বেশিদিন স্থায়ী হবে না। একই সময়ে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নৌযান চলাচল নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে চলেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব আলোচনা ইতিবাচক হলেও তা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের দ্রুত অবসান নিশ্চিত করে না।
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, "আমার মনে হয় যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হবে। তারা আর বেশিদিন চালিয়ে যেতে পারবে না।"
তিনি আরও দাবি করেন, তেহরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং পরিস্থিতি ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে। একই সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হলে জ্বালানি তেলের দাম কমে আসবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হচ্ছে—এমন দাবি নাকচ করেছে। তেহরানের বক্তব্য, তারা কেবল ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নৌপথ নিয়ে আলোচনা করছে।
এদিকে ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, দেশটির পার্লামেন্টের একটি কমিটি এমন একটি প্রাথমিক বিল পর্যালোচনা করছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং 'শত্রুভাবাপন্ন' দেশগুলোর জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
বৃহস্পতিবার ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালিতে নৌপথের সমন্বিত রুট নির্ধারণে নীতিগত সমঝোতায় পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে দুই দেশ। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এ বিষয়ে মতপার্থক্য দূর হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বৃহত্তর শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু হতে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের যুদ্ধ শিগগির শেষ হওয়ার দাবি নতুন নয়। গত কয়েক মাস ধরেই তিনি একদিকে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন, অন্যদিকে শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত রেখে কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলেছেন।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত বড় ধরনের সামরিক হামলা বাতিল করেন। তার দাবি ছিল, তেহরানসহ আঞ্চলিক কয়েকটি দেশ কূটনৈতিক অগ্রগতির সুযোগ দিতে হামলা স্থগিতের অনুরোধ জানিয়েছিল।
অন্যদিকে, মার্কিন সংবাদমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কমে আসার খবর প্রকাশিত হলে ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তবে লন্ডনভিত্তিক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট (RUSI)–এর জ্যেষ্ঠ গবেষক মাইকেল স্টিফেন্স বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই সংকট আরও বাড়বে এবং এতে অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে।
কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফট–এর নির্বাহী সহসভাপতি ত্রিতা পারসি মনে করেন, ট্রাম্পের বারবার হামলার হুমকি দিয়ে পরে তা প্রত্যাহার করার কৌশল সম্ভাব্য সমঝোতার বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করছে। তার ভাষায়, এ ধরনের পুনরাবৃত্ত আচরণ আলোচনার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
একই ধরনের মত দিয়েছেন মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট–এর কূটনৈতিক ফেলো অ্যালান আয়ার। তার মতে, বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হচ্ছে ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ প্রণালি নিয়ে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সরাসরি কোনো অর্থবহ আলোচনা চলছে বলে তিনি মনে করেন না।
ট্রাম্পের সর্বশেষ মন্তব্যের জবাবে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, "বড় হামলার হুমকি, তারপর হঠাৎ আলোচনার কথা—এটি একই নাটকের পুনরাবৃত্তি।" তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে "বাস্তবতা স্বীকার" এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষার আহ্বান জানান।
এদিকে রয়টার্সের জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে প্রণালিটি পুনরায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া বর্তমানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, শেষ পর্যন্ত এমন একটি সমঝোতা হতে পারে, যেখানে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনায় ইরানের ভূমিকা পুরোপুরি অস্বীকার করা হবে না। কারণ, নিজ উপকূলসংলগ্ন এই কৌশলগত জলপথের ব্যবস্থাপনা থেকে তেহরানকে সম্পূর্ণভাবে বাইরে রাখা বাস্তবসম্মত নয়।
সূত্র: আল জাজিরা