মাদক ব্যবসায়ী এবং অপরাধী গ্যাংগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জের ধরে শ্রীলঙ্কায় একাধিক কারাগারে বড় ধরনের সহিংসতা ও দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিনটি কারাগারে পুলিশ ও দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী বিশেষ ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছে। পৃথক এসব ঘটনায় অন্তত তিনজন বন্দি নিহত এবং আরও ২৩ জন আহত হয়েছেন।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) শ্রীলঙ্কার জননিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী আনন্দ উইজেপালা দেশটির পার্লামেন্টে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) গভীর রাতে রাজধানী কলম্বোর ‘নিউ ম্যাগাজিন প্রিজনে’ ৪০ জন বন্দি তাদের সেল ভেঙে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলে সংঘর্ষে এক বন্দি নিহত হন।
এর পরদিনই অর্থাৎ শুক্রবার সকালে রাজধানী থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ‘কুরুউইটা’ কারাগারে দ্বিতীয় দফায় দাঙ্গা শুরু হয়। সেখানে আরও দুজন বন্দি প্রাণ হারান।
মন্ত্রী জানান, এই দুই ঘটনার সংঘর্ষে মোট ২৩ জন বন্দি মারাত্মক আহত হয়েছেন। তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশ ও বিশেষ বাহিনী অভিযান চালিয়ে বর্তমানে দুটি কারাগারের পরিস্থিতিই নিয়ন্ত্রণে এনেছে।
এ ছাড়া রাজধানী থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের উপকূলীয় শহর নেগম্বোর একটি উন্মুক্ত কারাগারেও বন্দিরা বিক্ষোভ শুরু করেন। রয়টার্সকে পুলিশ জানিয়েছে, সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিক্ষোভকারী বন্দিদের লক্ষ্য করে টিয়ার গ্যাস বা কাদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়।
তিনটি কারাগারেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দাঙ্গা পুলিশকে বেশ বেগ পেতে হয়। বহু বন্দি কারাগারের ছাদে উঠে পড়েন এবং খোলা মাঠে নেমে আসেন। পরে পুলিশ তাদের নিজ নিজ ওয়ার্ডে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
পার্লামেন্টে মন্ত্রী আনন্দ উইজেপালা স্পষ্ট করে বলেছেন, এই সহিংসতার পেছনে মাদক ব্যবসায়ী ও প্রতিদ্বন্দ্বী অপরাধী চক্র জড়িত রয়েছে। সবগুলো ঘটনা একসঙ্গে ঘটে থাকায় এটি কোনো পরিকল্পিত অন্তর্ঘাতমূলক চেষ্টা কি না, তা সরকার খতিয়ে দেখছে। তিনি বলেন, একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হওয়ার পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত কথা বলা সম্ভব।
সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার কারাগারগুলোতে সহিংসতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এর ঠিক এক মাস আগেই নেগম্বোর একটি কারাগারে দুই দিনব্যাপী সংঘাত ঘটেছিল, যেখানে ১০ জন কারা কর্মকর্তা এবং ২০ জন বন্দি প্রাণ হারিয়েছিলেন। এমনকি গত সপ্তাহান্তেও কলম্বোর কাছের ‘মাহার’ কারাগারে এক দাঙ্গায় একজন বন্দি নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হন।
বর্তমানে শ্রীলঙ্কার কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি বন্দি অবস্থান করছেন। সম্প্রতি দেশের বিচারমন্ত্রী হার্শনা নানায়াকারা পার্লামেন্টে দেওয়া এক বক্তৃতায় জানান, শ্রীলঙ্কায় বর্তমানে মাত্র ১০ হাজার বন্দি রাখার মতো জায়গা রয়েছে। কিন্তু সেখানে গাদাগাদি করে রয়েছে ৩৯ হাজারের বেশি বন্দি।
বন্দিদের অধিকার বিষয়ক কমিটির সভাপতি সেনাকা পেরেরা বলেন, শ্রীলঙ্কার কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার চারগুণ বেশি বন্দি রাখা হয়েছে। সত্যি বলতে তারা দীর্ঘদিন ধরে অনেক ধৈর্য ধরেছেন।
তিনি আরও জানান, বন্দিদের একটি বড় অংশই মাদকমাত্রিক অপরাধে অভিযুক্ত এবং তাদের বিচার এখনো বাকি। সম্প্রতি জামিনের নিয়ম কঠোর করায় কারাগারে অপরাধীর সংখ্যা বিপুলভাবে বেড়ে গেছে।
দেশজুড়ে আদালতগুলোতে জট লেগে থাকা প্রায় ১০ লাখেরও বেশি মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করা এবং কারাগারের ভিড় কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির সরকার। এজন্য শ্রীলঙ্কার উচ্চ আদালতের বিচারকদের চাকরির মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানোর লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
সূত্র: আলজাজিরা