স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতায় (Ceuta) হওয়া নজিরবিহীন অভিবাসী সংকটের জেরে ইতালি এবং স্পেনের মধ্যে তীব্র কূটনৈতিক উত্তেজনা ও সীমান্তে পাল্টাপাল্টি কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। মূলত গত ৩০ ও ৩১ জুলাই প্রতিবেশী মরক্কো থেকে প্রায় ৭২ থেকে ৭৮ হাজার অভিবাসী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সমুদ্র ও স্থলপথে অবৈধভাবে স্পেনের সেউতায় প্রবেশ করার চেষ্টা করে।
এই অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এবং অভিবাসীরা যেন স্পেনের মাধ্যমে ইতালিতে ঢুকতে না পারে, সেই যুক্তিতে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির রক্ষণশীল সরকার স্পেনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত চলাচলের 'শেনজেন' (Schengen) চুক্তি আংশিকভাবে স্থগিত করে আকাশ ও সমুদ্রপথে কড়া তল্লাশি শুরু করে।
স্থানীয় সময় শুক্রবার (৭ আগস্ট) মধ্যরাত থেকে এ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হয়েছে। আগামী এক মাস তা বহাল থাকবে। এর এক সপ্তাহ আগে মরক্কো থেকে প্রায় ৭৮ হাজার অভিবাসী সেউতায় প্রবেশের পর ইতালিও স্পেন থেকে আসা যাত্রীদের ওপর একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল।
শুক্রবার স্পেন ইতালিকে রবিবারের মধ্যে ওই সীমান্ত তল্লাশি প্রত্যাহারের দাবি জানায়। তবে রোম জানিয়েছে, অন্তত ১৫ আগস্ট পর্যন্ত এ ব্যবস্থা বহাল থাকবে। ইতালির দাবি, ওই সময়ের মধ্যে সেউতায় ‘নতুন করে অভিবাসীদের ঢল’ নামার আশঙ্কা করছে স্পেন।
এ পরিস্থিতিতে স্পেনের সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এবং ইতালির রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধও প্রকাশ্যে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে ইইউর অভিবাসন নীতি আরও কঠোর করার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন মেলোনি।
ইতালির সঙ্গে স্পেনের কোনো স্থলসীমান্ত নেই। রোমের দাবি, সেউতায় প্রবেশ করা অভিবাসীদের ইতালিতে চলে যাওয়া ঠেকাতেই সাময়িকভাবে সীমান্তমুক্ত শেনজেন ব্যবস্থা স্থগিত করা হয়েছে।
তবে মাদ্রিদ এ যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, ইতালির অবস্থান ‘ভিত্তিহীন যুক্তির’ ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কারণ সেউতায় প্রবেশ করা অভিবাসীদের শেনজেন এলাকায় প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই।
শুক্রবার স্পেনের দেওয়া সময়সীমার প্রতিক্রিয়ায় ইতালি জানায়, তারা কোনো ‘আল্টিমেটাম’ গ্রহণ করবে না। ইতালির সরকার বলেছে, তৃতীয় দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে স্পেন থেকে আগতদের জন্য শেনজেন চুক্তির প্রয়োগ স্থগিতের সিদ্ধান্ত অন্তত ১৫ আগস্ট পর্যন্ত পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর না হওয়া পর্যন্ত এ ব্যবস্থা বহাল রাখার কথাও জানিয়েছে রোম।
ইতালির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশটির স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সীমান্ত তল্লাশির সময় স্পেনসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশের নাগরিকদের সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করছে।
ইতালি আরও জানিয়েছে, স্পেনের নাগরিকদের অতিরিক্ত তল্লাশির আওতায় রাখা হচ্ছে না। এ ব্যবস্থা শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশের নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য।
তবে স্পেনের সংবাদমাধ্যম ‘এল পাইস’ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কয়েকটি বিমানবন্দরের টার্মিনালে দীর্ঘ সারি ও অপেক্ষার সৃষ্টি হয়েছে। স্পেন থেকে আসা যাত্রীদের তল্লাশির জন্য আলাদা লাইনে পাঠানো হচ্ছে।
অন্যদিকে, শুক্রবার মাদ্রিদ যে পাল্টা ব্যবস্থা ঘোষণা করেছে, তার আওতায় ইতালি থেকে স্পেনে আসা ইতালীয় নাগরিক ও অন্যান্য দেশের যাত্রীদের পাসপোর্ট, জাতীয়তা ও ভিসা পরীক্ষা করা হবে। স্পেন সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশে ‘অবিরাম অনিয়মিত অভিবাসনচাপ’ অব্যাহত থাকায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে সময়সীমা কমানো বা পরিবর্তন করা হতে পারে।
শেনজেন চুক্তির সাময়িক স্থগিতাদেশ অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। ইতালিও স্লোভেনিয়ার সঙ্গে তার সীমান্তে একই ধরনের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
ইতালির শেনজেন স্থগিতের সিদ্ধান্তকে ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক সমর্থন করেছে। অন্যদিকে, চেক প্রজাতন্ত্র সাময়িকভাবে শেনজেন ব্যবস্থা থেকে স্পেনের সদস্যপদ স্থগিতের আহ্বান জানিয়েছে।
গত সপ্তাহে সেউতায় প্রবেশ করা বেশিরভাগ অভিবাসীকে কয়েক দিনের মধ্যেই মরক্কোতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে সেখানে এখনো প্রায় ১ হাজার ৪০০ অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থান করছে। তাদের মধ্যে অনেকেই খুব অল্প বয়সী ছেলে ও মেয়ে।
মরক্কো থেকে সেউতায় নতুন করে অভিবাসীদের ঢল নামার আশঙ্কার কথা স্পেন আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। তবে মরক্কোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের নতুন করে সীমান্ত অতিক্রমের পরিকল্পনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এ আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে ‘এল পাইস’ জানিয়েছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সংবাদমাধ্যমটিকে জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তবে গত সপ্তাহের মতো পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হবে বলে তারা মনে করছে না।