১৮ বছরে ৩৯ বার ক্লাব বদল: ‘চিরভ্রমণকারী’ ফুটবলারের গল্প

পেশাদার ফুটবলে দলবদল মানেই কোটি টাকার লোভনীয় চুক্তি আর নতুন ঠিকানায় থিতু হওয়ার স্বস্তি। কিন্তু সেটি আর কয়বার হয়? চার-পাঁচবার বা হয়তো এর থেকে দুই-একবার বেশি। তবে এই সংখ্যা জেফ টমাসের কাছে কিছুই না। কেননা, এই ইংলিশ উইঙ্গার অর্থের পেছনে ছুটে বা পছন্দের পারিশ্রমিক না পেয়ে ১৮ বছরের ক্যারিয়ারে  ক্লাব পরিবর্তন করেছেন রেকর্ড ৩৯ বার!

সম্প্রতি বিট্রিশ গণমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে, নিজের ক্যারিয়ারের শুরুতে অর্থের গুরুত্ব বুঝিয়ে দিয়ে টমাস বলেন, ‘আমার কাঙ্ক্ষিত পারিশ্রমিক না পেলে আমি ঠিকই অন্য ক্লাবে চলে যেতাম।’ ইংল্যান্ডের নিচুতলার লিগ থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও বেলজিয়াম; পেশাদার ফুটবলের যাবতীয় ঠিকানায় ঘুরে বেড়ানো এই ‘জার্নিম্যান’ এখন থিতু হয়েছেন কোচিংয়ের ডাগআউটে।

ব্র্যাডফোর্ডে জন্ম নেওয়া ৩৬ বছর বয়সী টমাসের ক্যারিয়ার যেন রূপকথার চেয়েও নাটকীয়। রথারহাম ইউনাইটেডের যুব দল থেকে শুরু হওয়া তার পথচলা কখনো থামেনি। ক্যারিয়ারের শুরুতে নিজের খামখেয়ালি আচরণের কথা স্মরণ করে তিনি অকপটে জানান, ‘তরুণ বয়সে আমি একটু উদ্ধত ও বোকা ছিলাম। যদি আমার মানসিকতা আরেকটু পেশাদার হতো, তবে ক্যারিয়ারটা হয়তো আরও অনেক ভালো হতে পারত।’

একটু বেশি অর্থের লোভে বা মনের মতো পারিশ্রমিক না পেলেই তিনি ব্যাগ গুছিয়ে অন্য ক্লাবে পাড়ি জমাতেন। একেক মৌসুমে চার-পাঁচটি ক্লাব বদলানোর রেকর্ডও রয়েছে তার ঝুলিতে। যেমন, ২০১৩-১৪ মৌসুমেই তিনি খেলেছিলেন শেফিল্ড, মিকলওভার স্পোর্টস, স্কারবোরো অ্যাথলেতিক, ম্যাটকল টাউন এবং গুল এফসির হয়ে। একইভাবে ২০১৬-১৭ মৌসুমের শুরুতে মিকলওভার স্পোর্টসে ফিরলেও সেখান থেকে একে একে শ’ লেন, স্টাফোর্ড রেঞ্জার্স, ফ্রিকলি অ্যাথলেটিক হয়ে শেষ পর্যন্ত আবার মিকলওভারেই ফিরেছিলেন। এছাড়া ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ব্রাইটহাউস টাউনের (দ্বিতীয় দফা) হয়ে ক্যারিয়ারে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন তিনি।

স্টকসব্রিজ পার্ক স্টিলসে খেলার সময় তার প্রতিপক্ষ হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন হ্যালিফ্যাক্স টাউনের তৎকালীন তারকা জেমি ভার্ডি, যিনি পরবর্তীতে ইংল্যান্ড জাতীয় দলে খেলার পাশাপাশি ২০১৫-১৬ মৌসুমে লেস্টার সিটির হয়ে প্রিমিয়ার লিগ জয়ের ইতিহাস গড়েছিলেন। কখনো যুক্তরাষ্ট্রের গার্ডেন সিটি ব্রনকবাস্টার্স, কখনো কানাডার থান্ডার বে চিল, আবার কখনো বেলজিয়ামের মন্টেনি; নানা দেশের ফুটবল সংস্কৃতিকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি।

ইনজুরি আর হতাশা একপর্যায়ে তাকে বুট জোড়া চিরতরে তুলে রাখার কথাও ভাবিয়েছিল, রথারহামের এক কল সেন্টারে চাকরি কিংবা সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত ফুটবলই তাকে টেনে রেখেছে। খেলোয়াড়ি জীবনের সেই যাযাবর জীবন এখন পেছনে ফেলে টমাস নতুন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। ২০২৪ সাল থেকে নবম সারির-এর ক্লাব ডিয়ার্ন অ্যান্ড ডিস্ট্রিক্টের খেলোয়াড়-ম্যানেজারের যৌথ দায়িত্ব নিয়ে ক্লাবটিকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। ক্লাবের এই অবিশ্বাস্য সাফল্য নিয়ে তিনি বলেন, ‘২০২১ সালে আমরা ডনকাস্টার স্যাটারডে লিগে খেলতাম, আর আজ আমরা এফএ কাপের মূল পর্বে খেলছি। স্থানীয় এলাকার মানুষের জন্য এটি সম্পূর্ণ নতুন ও রোমাঞ্চকর এক অভিজ্ঞতা।’ 

বর্তমান জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট থমাস জানান, নিজের অতীতের সেই ঘন ঘন ক্লাব বদলের সিদ্ধান্তকে এখন তরুণদের সামনে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন একটু অন্যভাবে। ডাগআউটে দাঁড়িয়ে শিষ্যদের পরামর্শ দিয়ে তিনি আরও যোগ করেন, ‘মাঝে মাঝে নিজেকে কিছুটা ভণ্ড মনে হয়, কারণ অতীতে আমি অতিরিক্ত টাকার জন্য ক্লাব বদল করতাম। এখন আমি আমার খেলোয়াড়দের বলি, 'তোমরা শুধু নিজেদের খেলা চালিয়ে যাও, টাকা ঠিকই চলে আসবে'।’ মাঠের রোমাঞ্চকর সব অভিজ্ঞতা সঙ্গী করে জীবনের এই পর্যায়ে এসে নিজের এলাকায় স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে বেশ শান্ত ও থিতু এক জীবন কাটাচ্ছেন ফুটবলের এই চিরভ্রমণকারী।