‘লুটপাটের’ নতুন লাইসেন্স জ্বালানি খাতের বেসরকারিকরণ: জামায়াত

পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত ও বিপণন বেসরকারি খাতে দেওয়ার সরকারি উদ্যোগকে ‘লুটপাটের নতুন লাইসেন্স’ বলে মন্তব্য করেছে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। দলটির আশঙ্কা, রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ভেঙে প্রতিযোগিতা তৈরির নামে শেষ পর্যন্ত কয়েকটি প্রভাবশালী বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে জ্বালানি বাজার চলে যেতে পারে।

আজ শনিবার (৮ আগস্ট) বিকেলে ঢাকার মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব কথা বলেন। ‘সরকারের নতুন জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়নের পদক্ষেপ’ নিয়ে দলের বক্তব্য ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

লিখিত বক্তব্যে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জ্বালানি খাত সংস্কারের পরিবর্তে এর নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর খরচ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে বহন করতে হবে।

জামায়াতের এই নেতা বলেন, পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন বেসরকারি খাতে দেওয়ার জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ খসড়া নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন বিপিসি চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার চার দিনের মধ্যে এ খসড়া তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘এটি সংস্কার নয়, এটি হস্তান্তর। এটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি দুর্নীতি ও লুটপাটের লাইসেন্স।’

রাষ্ট্রীয় একচেটিয়ার বদলে বেসরকারি একচেটিয়ার আশঙ্কা
বেসরকারি খাতকে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দিলে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং দাম কমবে-সরকারের এ যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে জামায়াত। পরওয়ার বলেন, এ ব্যবসায় গভীর সমুদ্রবন্দর, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, বড় ট্যাংক টার্মিনাল, পাইপলাইন ও বিপুল ব্যাংকিং সক্ষমতা প্রয়োজন। ফলে বাস্তবে হাতেগোনা কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর পক্ষেই এ বাজারে প্রবেশ করা সম্ভব হবে।

এতে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়ার পরিবর্তে বেসরকারি একচেটিয়া তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

বিপিসিকে অদক্ষ ও লোকসানি দেখিয়ে বেসরকারিকরণের যুক্তিও প্রত্যাখ্যান করেছে জামায়াত। পরওয়ারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসি ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৫০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এর আগে ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি যথাক্রমে ১ হাজার ৯৮৩ কোটি ও ৭ হাজার ৮৭ কোটি টাকা লোকসান করেছিল।

জামায়াতের দাবি, বর্তমান জ্বালানি সংকট বিপিসির ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার কারণে নয়; এর পেছনে বিশ্ববাজার ও ভূরাজনৈতিক সংকট রয়েছে। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও দেশে ভোক্তাদের ওপর চাপ কমাতে দাম না বাড়ানোর কারণে বিপিসি প্রতিদিন প্রায় ৭৮ কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে বলে জ্বালানিমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন।

দরপত্রের সময় কমানো নিয়ে প্রশ্ন
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও সরবরাহ সংকটকে কাজে লাগিয়ে সরকার তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন পরওয়ার।

তিনি বলেন, গত ২৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে বড় আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণ কমে গিয়ে দরদাতা সংকট, বেশি দাম ও সিন্ডিকেটের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

পরওয়ার বলেন, ‘দ্রুততা আর স্বচ্ছতা পরস্পরবিরোধী নয়। কিন্তু এখানে দ্রুততার নামে স্বচ্ছতাই বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে।’

তার দাবি, বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি বাজার কয়েকটি গোষ্ঠীর হাতে গেলে প্রতি লিটারে সামান্য বাড়তি মুনাফাও বছরে হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত আয়ে পরিণত হতে পারে।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা
জ্বালানি তেলকে সাধারণ পণ্য নয়, কৃষি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, বিমান চলাচল ও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন পরওয়ার।

বাংলাদেশে একটি মাত্র শোধনাগার-ইস্টার্ন রিফাইনারি-এবং সীমিত মজুত সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, যুদ্ধ বা দুর্যোগের সময় বেসরকারি কোম্পানিকে রাষ্ট্র কীভাবে নির্দেশ দেবে। দুর্গম ও অলাভজনক এলাকায় জ্বালানি সরবরাহের দায়িত্ব বেসরকারি কোম্পানিগুলো নেবে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

এ ছাড়া জ্বালানি খাতের শ্রমিক সংগঠনের আইনি সুরক্ষা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন পরওয়ার। শ্রম আইনের ১৮৭ ধারা জ্বালানি খাতের শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের ক্ষেত্রে রহিত করার সুপারিশ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

ছয় দফা দাবি জামায়াতের
জামায়াত পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত ও বিপণন বেসরকারি খাতে দেওয়ার উদ্যোগ অবিলম্বে স্থগিতের দাবি জানিয়েছে।

দলটির অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে-খসড়া নীতিমালাসহ সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ করে অন্তত ৬০ দিনের জনমত গ্রহণ, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অধীনে উন্মুক্ত শুনানি এবং বেসরকারিকরণের পরিবর্তে বিপিসির সংস্কার।

এ ছাড়া স্বাধীন নিরীক্ষা, বিপিসির বোর্ডে পেশাদারদের নিয়োগ, জ্বালানি তেল ক্রয়ে ই-জিপি বাধ্যতামূলক করা এবং প্রতি ত্রৈমাসিকে আমদানি মূল্য ও পরিমাণ প্রকাশের দাবি জানিয়েছে দলটি। ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট ও কৌশলগত মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন এবং শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা খর্বের সুপারিশ প্রত্যাহারেরও দাবি জানানো হয়েছে।

পরওয়ার বলেন, জামায়াত বাজার অর্থনীতি বা বেসরকারি বিনিয়োগের বিরোধী নয়; তারা জবাবদিহিহীন হস্তান্তরের বিরোধিতা করছে।

তিনি বলেন, ‘প্রতিযোগিতা মানে একচেটিয়া হাতবদল নয়। সংস্কার মানে প্রতিষ্ঠান মেরামত, প্রতিষ্ঠান বিক্রি নয়। জ্বালানি নিরাপত্তা মানে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ, গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ নয়।’

সংবাদ সম্মেলনে পাবনা-১ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদসহ দলের অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।