লিওনেল মেসিকে ইতিহাসের সেরা ফুটবলার বানানোর নেপথ্য নায়ক বাবা হোর্হে মেসি আর নেই। দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করার পর ৬৮ বছর বয়সে শুক্রবার রোজারিওর একটা ক্লিনিকে মৃত্যুবরণ করেছেন তিনি।
বেশ কিছুদিন ধরেই শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন হোর্হে মেসি। জাতীয় দলের হয়ে কানসাস সিটিতে ক্যাম্প যোগ দেওয়ার পর দীর্ঘ প্রায় দুই মাস বাবাকে দেখতে পাননি আর্জেন্টিনার মহাতারকা। আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে নিজের প্রথম গোলের পর মেসির চোখের জলই স্পষ্ট করে দিয়েছিল তার বাবার শারীরিক অবস্থা কতটা আশঙ্কাজনক ছিল। স্পেনের সঙ্গে ১৯ জুলাইয়ের ফাইনাল শেষে তাই জরুরি ভিত্তিতে রোজারিওতে ছুটে যান তিনি। ১০ দিন সেখানে কাটিয়ে ইন্টার মায়ামিতে ফিরেছিলেন। বাংলাদেশ সময় আজ ভোরে লিগস কাপের দ্বিতীয় ম্যাচ খেলার কথা ছিল তার। কিন্তু তার কয়েক ঘণ্টা আগে বাবার মৃত্যু সংবাদ পান মেসি।
১৯৫৮ সালের ১ জানুয়ারি রোসারিওতে জন্ম নেওয়া জর্জে মেসি জীবনের বড় একটা সময় একটি মেটালওয়ার্কিং ফ্যাক্টরি সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন। প্রচারের আলো থেকে দূরে সাদামাটা জীবনযাপন করা এই মানুষটিই পরে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজত্ব গড়ার মূল কারিগর হয়ে ওঠেন।
মেসির শৈশবে যখন গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি ধরা পড়ে, তখন জর্জে জীবনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তটি নেন পরিবার ছেড়ে বার্সেলোনায় পাড়ি জমানো। বার্সেলোনা ক্লাবের সঙ্গে আলোচনা করে চিকিৎসার খরচ বহন করানোর চুক্তি তিনিই নিশ্চিত করেন। ‘আমি আছিন্দারে কাজ করতাম এবং ফাউন্ডেশনের সঙ্গে কথা বলি। দুবছর তারা চিকিৎসার খরচ দিয়ে সাহায্য করেছিল, কিন্তু পরে তা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল’ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন হোর্হে
গ্রান্দোলি ক্লাব থেকে নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজ, আর সেখান থেকে বার্সেলোনা লিওর প্রাথমিক দিনগুলো থেকে শুরু করে পেশাদার ক্যারিয়ারের প্রতিটি পদে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন হোর্হে। এজেন্ট হিসেবে আনুষ্ঠানিক কোনো পড়াশোনা বা পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও, সময়ের প্রয়োজনে চুক্তি ও বাণিজ্যিক বিষয়গুলো পরিচালনায় দক্ষ হয়ে ওঠেন তিনি।
বার্সেলোনায় মেসির একের পর এক চুক্তি নবায়ন, সব বিতর্ক থেকে ছেলেকে দূরে রেখে খেলায় মনোযোগী রাখা এবং পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালে বার্সেলোনা ছেড়ে পিএসজি ও পরে ইন্টার মায়ামিতে স্থানান্তরের আলোচনায় মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন হোর্হে মেসি।
বাবার এই অবদান স্মরণ করে বিভিন্ন সময়ে মেসি বলেছেন, ‘খেলার বিষয়ে আমি বাবার সঙ্গে প্রচুর কথা বলতাম। আমার পুরো ক্যারিয়ারে উনি সবসময় আমার পাশে ছিলেন। ম্যাচ শেষ হলেই তাকে মেসেজ দিতাম বা ফোনে কথা বলতাম। খেলাধুলা এবং জীবন সবকিছুই আমি বাবার সঙ্গে শেয়ার করি। তিনি আমার পারফরম্যান্স নিয়ে খুব সমালোচনা করতেন, যা আমাকে প্রতিনিয়ত নিজেকে উন্নত করতে অনুপ্রাণিত করত। উনি জানতেন যে, আমি নিজেও আমার সবচেয়ে বড় সমালোচক। অন্যদিকে, মায়ের কাছে আমি সবসময়ই সেরা এমনকি আমি খারাপ খেললেও! মা মনে করেন আমি প্রতিটি ম্যাচেই ভালো খেলেছি, সেখানে আমার কোনো দোষ থাকে না। সব মায়েদের মতো উনিও তেমনই।’
প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকে, সমস্ত সমালোচনা সহ্য করে ছেলেকে ইতিহাসের সেরা ফুটবলার হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে হোর্সে মেসি সবসময় এক নীরব ও শক্তিশালী স্তম্ভ হয়ে ছিলেন।