ফুটবলের সবুজ গালিচায় যখনই জাদুকরী পারফর্ম করতেন, পর্দার আড়ালে ছায়ার মতো পাশে থাকতেন সেই মানুষটি হোর্হে মেসি। ৬৮ বছর বয়সে সেই অভিভাবক চিরতরে না ফেরার দেশে পাড়ি জমানোর পর থমকে গেছে লিওনেল মেসির পৃথিবী। বাবার অন্তিম যাত্রায় অংশ নিতে জন্মভূমি রোজারিওতে ছুটে যাওয়ার কারণে মন্টেরির বিপক্ষে লিগস কাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটিতে মাঠে ছিলেন না ইন্টার মায়ামি অধিনায়ক।
তবে অনুপস্থিত থেকেও পুরো ম্যাচজুড়ে মেসি ছিলেন সবার কেন্দ্রবিন্দুতে। সতীর্থদের কালো আর্মব্যান্ড পরা, গ্যালারির আবেগঘন ব্যানার আর প্রিয় বন্ধুর উদ্দেশ্যে করা রদ্রিগো ডি পলের এক চমৎকার গোল উৎসর্গ সব মিলিয়ে এক হৃদয়বিদারক সন্ধ্যার সাক্ষী হলো মায়ামি।
ম্যাচ শুরুর আগে স্তব্ধ স্টেডিয়ামে হোর্হে মেসির স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয় এবং জায়ান্ট স্ক্রিনে ভেসে ওঠে তার নাম। ম্যাচের নির্ধারিত সময়ের দশম মিনিট যা মেসির বিখ্যাত জার্সির নম্বরের সংখ্যা, তা আসতেই গ্যালারির হাজারো সমর্থক দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে ও ‘ফুয়ের্সা লিও’ (শক্তিশালী থাকো, লিও) লেখা ব্যানার উঁচিয়ে সমবেদনা জানান তাদের প্রিয় ক্যাপ্টেনের প্রতি।
এই কঠিন সময়ে মাঠে সতীর্থদের নেতৃত্ব দেওয়া ডি পল ৩২ মিনিটে গোল করে এগিয়ে দেন দলকে। গোল করার সঙ্গে সঙ্গেই জার্সি খুলে ভেতরে থাকা মেসির ১০ নম্বর জার্সিটি উঁচিয়ে ধরে মাঠে দারুণ এক আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি করেন তিনি, যা উৎসর্গ করেন শোকার্ত বন্ধু ও তার পরিবারকে।
ক্লাব, সতীর্থ ও প্রতিপক্ষের শ্রদ্ধা
ম্যাচের পর মেসির বাবার প্রয়াণে শোক জানিয়ে ইন্টার মায়ামি তাদের এক অফিশিয়াল বিবৃতিতে জানায়, ‘আমাদের হৃদয় আমাদের অধিনায়ক লিও এবং পুরো মেসি পরিবারের সঙ্গেই রয়েছে।’
লুইস সুয়ারেজ ইনস্টাগ্রামে এক বার্তায় লিখেছেন, ‘বন্ধু, তোমাকেও এবং তোমার পরিবারকে খুব শক্ত করে আগলে ধরছি। তোমার বাবা উপর থেকে আগের মতোই সবসময় গর্বের সঙ্গে তোমাকে আগলে রাখবেন। এই কঠিন সময়ে মেসি পরিবারের প্রতি আমার সমস্ত ভালোবাসা রইল। শান্তিতে ঘুমাও, হোর্হে।’
এদিকে মায়ামি তাদের ম্যাচপরবর্তী সংবাদমাধ্যমের আনুষ্ঠানিকতা বাতিল করলেও প্রতিপক্ষ মন্টেরির কোচ মাতিয়াস আলমেইদা সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই সমবেদনা জানিয়ে বলেন, ‘মেসির পরিবারের এই অপূরণীয় ক্ষতি এবং তাদের চরম কষ্টের সময়ে আমি ও আমার পরিবারের পক্ষ থেকে গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।’
মায়ামির হারের দিনেও ম্যাচের পটভূমিতে মেসি
লিগস কাপের এই ম্যাচ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে মায়ামি হেরে গেলেও ম্যাচের সম্পূর্ণ পটভূমিতে ছিল মেসিকে ঘিরেই। ফুটবল বিশ্বের প্রতিটি কোণ থেকে বার্সেলোনা, নিউওয়েলস ও দক্ষিণ আমেরিকান কনফেডারেশনের মতো ক্লাব ও সংস্থাগুলো মেসির পরিবারের প্রতি তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সমবেদনা জানায়। বিশ্বমঞ্চে ৮ বারের ব্যালন ডি'অর জয়ী এই তারকার ফুটবল সাম্রাজ্যের মুকুটহীন সম্রাট ও পথপ্রদর্শক ছিলেন তার বাবা হোর্হে।
নীরবতা পালন বার্সাতেও
ইতালির উদিনেতে অনুষ্ঠিত এক ত্রিদেশীয় প্রীতি টুর্নামেন্টে (যেটিতে বার্সেলোনা, নটিংহ্যাম ফরেস্ট ও উদিনেসে অংশ নেয় এবং প্রতিটি দল দুটি করে ৪৫ মিনিটের ম্যাচ খেলে) হোর্হে মেসির প্রয়াণে শ্রদ্ধা জানিয়েছে মেসির সাবেক ক্লাব বার্সেলোনাও। ল'ইকুইপের তথ্য অনুযায়ী, নটিংহ্যাম ফরেস্টের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে হোর্হে মেসির স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করে বার্সেলোনা, যার আগে ক্লাবের সোশ্যাল মিডিয়া চ্যানেলগুলোতেও শোকবার্তা প্রকাশ করা হয়েছিল।
হু বছর আগে বার্সেলোনায় প্রথম পা রাখার সেই কঠিন দিনগুলোতে বাবাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করা ছোট্ট লিওর স্মৃতিচারণ আজ সত্য হয়ে ফিরে এসেছে। সব শঙ্কা ও লড়াই পেরিয়ে এখন রোজারিওতে এই অন্তহীন শোক সামলানোর কঠিন লড়াইয়েই লিপ্ত বিশ্বফুটবলের এই বরপুত্র।