সম্পাদিত গ্রন্থ হওয়ার পরও কিছু কিছু গ্রন্থ বাড়তি মনোযোগের দাবি রাখে। বাংলায় ফটোগ্রাফিশিল্প নিয়ে সাধারণের অজ্ঞাতসারে বেশ কিছু কাজ হলেও, জ্ঞাত আকরগ্রন্থ নেই বললেই চলে। সাহাদাত পারভেজ আলোকচিত্রপুরাণ : বাংলায় ফটোগ্রাফির আদি প্রবন্ধ নামে তার অসাধারণ গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন সেই দায় থেকেই। এ কারণে লেখকের তৃপ্তিমাত্রা বেশি। চারদিকে সম্পাদনার নামে ইঁদুর দৌড়ের বিপরীতে ধীরস্থির লয়ে কাজটা করেছেন তিনি; মানসম্মত রচনাগুলো ছেনে এনে ফটোগ্রাফিশিল্পের ধারাবাহিক ইতিহাস পরিস্ফুটনের মেধাসাধ্য কাজ আয়াস সহকারেই সম্পন্ন করতে পেরেছেন। সাহাদাত নিজে যে অন্বয় নিয়ে বিশেষ ভাবিত ছিলেন, তার প্রত্যক্ষ নিদর্শন গ্রন্থটিতে হাজির রয়েছে। তার অক্লান্ত পরিশ্রম, সুষম অন্বয়, সুচারু বিন্যাসের দরুন পাঠক এ গ্রন্থের খোলা বাতায়ন দিয়ে ঢুকে মস্তিষ্কের খোরাক জোগাতে পারবেন।
১৮৩৯ সালে ফ্রান্সে ক্যামেরা আবিষ্কারের অব্যবহিত পরের বছরই ভারতবর্ষকে আলোকিত করে এই হঠাৎ আলোর ঝলকানি। সেই আলোর নিয়ন্ত্রণ অবশ্য এলিটদের হাতেই ছিল। সাধারণের নাগালে আসতে আসতে বয়ে যায় অন্তত চারটি যুগ। ১৮৮৫ সালের এপ্রিল মাসে বাংলা ভাষায় লেখা হয় এ সংক্রান্ত প্রথম প্রবন্ধ। এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেন ‘শিল্পপুষ্পাঞ্জলি’ সম্পাদক অমৃতলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপর অজস্র রথী-মহারথী গেঁথে তুলেছেন ফটোগ্রাফি চর্চার বিস্তৃত ইমারত। সাহিত্যের সঙ্গে মেলাতে গেলে এই ধারাটা অবশ্য বেশ পিছিয়ে। বাংলা সাহিত্যের যৌবনযুগে যখন নবজাগরণের আলোয় চিন্তা ও সৃষ্টির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছিল, তখন ফটোগ্রাফি ছিল শিল্পের আঙিনায় এক নবীন আগন্তুক। সেই সময়ে কয়েকজন দূরদর্শী রেনেসাঁস-মনস্ক মানুষ এই নতুন মাধ্যমের সম্ভাবনা উপলব্ধি করে এর চর্চা ও প্রসারে আত্মনিয়োগ করেন। তাদের গভীর অনুধ্যান, সৃজনশীলতা ও মননের স্পর্শে বাংলায় ফটোগ্রাফিচর্চার এক সুদৃঢ় ভিত্তি নির্মিত হয়। ১৮৮৫ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সময়ে অমৃতলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায়সহ বহু বিশিষ্ট মনীষী ফটোগ্রাফি নিয়ে প্রবন্ধ রচনা করেন। বাংলা ভাষায় লেখা এই অমূল্য প্রবন্ধগুলো একত্রে সংকলনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় ও প্রয়োজনীয় প্রয়াস।
আটাশটি কিস্তিতে বিন্যস্ত কথামুখ সদৃশ ‘নব জাগরণের স্বর্ণসময় ও বাংলায় ফটোগ্রাফিচর্চা’ শীর্ষক অংশে সাহাদাত এ গ্রন্থটির আদ্যোপান্ত ধারণা দিয়েছেন বিশদে। ফটোগ্রাফির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তি, পত্রিকা ও প্রতিষ্ঠানের কথাও সংগতকারণেই এসেছে। ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘ভাণ্ডার’, ‘ভারতী’, ‘সাধনা’, ‘প্রবাসী’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘বিজ্ঞান দর্পণ’, ‘সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা’, ‘বঙ্গশ্রী’, ‘সওগাত’ ইত্যাদি শীর্ষস্থানীয় সাময়িকপত্র ঘেঁটে তিনি ৩১টি আলোকচিত্রবিষয়ক প্রবন্ধ সংগ্রহ করেন। তবে সুযোগ থাকলেও সবকটিই তিনি প্রকাশ করেননি। যাচাই-বাছাই শেষে ২৬টি লেখা এ গন্থে ঠাঁই পেয়েছে।
‘ভূমিকা’ অংশটা পড়লেই বোঝা যায় লেখক দীর্ঘ সময় নিয়ে এটা লিখেছেন। অনেক হারানো ও দুষ্প্রাপ্য প্রবন্ধের একত্র সম্মিলন ঘটিয়েছেন তিনি ‘লুপ্ত সভ্যতার প্রত্ন আবিষ্কারের’ ভঙ্গিমায়। নেপথ্যের কাহিনিগুলোর মধ্যে জুড়ে থেকে পাঠকের কৌতূহল আরও বৃদ্ধি করবে। তা ছাড়া সম্পাদনার ব্যাপারে তার নিজের বক্তব্য : ‘ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বোঝার স্বার্থে প্রকাশের সাল অনুযায়ী প্রবন্ধগুলো পরপর সাজিয়েছি। মূল প্রবন্ধের বানানরীতি অটুট রেখেছি।... প্রথম দিকের প্রবন্ধগুলো অনেকটা বিজ্ঞানকেন্দ্রিক। পরের প্রবন্ধগুলো শিল্পের দিকে মোড় নিয়েছে। বাংলা ভূখণ্ডের ফটোগ্রাফি বর্তমান শিল্প দুনিয়ার যে জায়গায় আসীন, তার ভিত রচিত হয়েছিল কিন্তু এসব প্রবন্ধের ওপর ভর করেই। অথচ ফটোগ্রাফির এই আদি প্রবন্ধগুলো দীর্ঘকাল কেউ পাঠকের নজরে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেননি।’ সাহাদাত সেই উদ্যোগ আয়োজন করেই নিয়েছেন।
এই গ্রন্থে সংযোজিত হয়েছে ৭৮টি দুর্লভ আলোকচিত্র, একটি পেইন্টিং, দুটি পেন্সিল স্কেচ এবং আটটি আখ্যাপত্রের প্রতিলিপি। এর অধিকাংশই দীর্ঘদিন আগে হাফটোন ব্লকে মুদ্রিত হয়েছিল এবং আজও অগণিত পাঠকের অদেখা। কিছু ছবি পরিচিত হলেও অনেকেই জানতেন না সেগুলোর আলোকচিত্রী কে, কোথায় বা কোন প্রেক্ষাপটে ছবিগুলো ধারণ করা হয়েছিল। সম্পাদক সেই অজানা ইতিহাস অনুসন্ধানের প্রয়াস নিয়েছেন; বহুক্ষেত্রে উদ্ধার করেছেন আলোকচিত্রীর পরিচয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয়নি। নিশ্চিত তথ্যের ভিত্তিতে ছবিগুলোর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে যথাযথ ক্রেডিট আর অজ্ঞাত পরিচয়ের ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়েছে ‘অজানা’। গ্রন্থে ব্যবহৃত অধিকাংশ ছবির মূল নেগেটিভ বা প্রিন্ট আজ আর সংরক্ষিত নেই। তাই পুরনো পত্রিকা থেকে সংগ্রহ ও স্ক্যান করেই অনেক ছবি পুনরুদ্ধার করেছেন তিনি। কিছু দুর্লভ প্রতিলিপি সংগ্রহ করতে দারস্থ হয়েছেন কলকাতা ও ইংল্যান্ডের অনলাইন উৎসের।
ডাগুয়েরোটাইপ থেকে ডিজিটাল প্রযুক্তির দীর্ঘ অভিযাত্রায় ফটোগ্রাফি আজ দৃশ্যশিল্পের অন্যতম শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য মাধ্যম। বাংলার প্রায় দুই শতকের এই গৌরবময় ফটোগ্রাফি-ইতিহাসের নানা অধ্যায় অনুসন্ধান করে সাহাদাত পারভেজ নির্মাণ করেছেন তার অনন্য সৃষ্টি আলোকচিত্রপুরাণ। গ্রন্থটি সচেতন ও সংবেদনশীল পাঠকের মানসসঙ্গী হয়ে উঠবে।