নাফ নদে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে বাংলাদেশি জেলেদের প্রায়ই অপহরণ ও ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। সীমান্তবর্তী এই নদে মাছ শিকার করতে গিয়ে জেলেরা চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন। ৯ আগস্ট এরই চিত্র উঠেছে দেশ রূপান্তরে। একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে টেকনাফের নাফ নদে মাছ শিকারে গিয়ে ফিরে না আসা জেলে লিটন মিয়ার পরিবারের আর্তি। ২৪ মার্চ মাছ শিকার করতে গিয়ে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার লিটন মিয়া অপহৃত হন। ২৭ মার্চ তার পরিবার খবর পায় তিনি মিয়ানমার কারাগারে বন্দি। লিটন মিয়ার স্ত্রী রোজিনার বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত চার মাস দরজায় দরজায় ঘুরেছেন তিনি। কারাগার থেকে লিটনকে মুক্ত করতে যে যেখানে বলেছেন ছুটে গেছেন রোজিনা, কিন্তু নিষ্ফল তার ছোটাছুটি। লিটনের সঙ্গে আরও ১৫ জেলে একই দিন আটক হন মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে। সপ্তাহে সপ্তাহে বিকাশে টাকা যায়। আর স্বজনের জন্য পথ চেয়ে থাকে পরিবার। মিয়ানমারের বহুমুখী উৎপাতের মাশুল বাংলাদেশ গুনতে পারে না। এসব ব্যাপারে বাংলাদেশের আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া জরুরি বলেও আমরা মনে করি।
দেশ রূপান্তরের অনলাইন সংস্করণে অন্য আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৮ আগস্ট নাফ নদ ও বঙ্গোপসাগরের সঙ্গমস্থল নাইক্ষ্যংদিয়া এলাকা থেকে মাছ ধরার সময় ট্রলারসহ তিন বাংলাদেশি জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সদস্যরা। স্থানীয়দের দাবি, বাংলাদেশের জলসীমায় মাছ ধরার সময় তাদের অস্ত্রের মুখে আটক করে নিয়ে যায়। অন্যদিকে বিজিবির ভাষ্য, জলসীমা অতিক্রম করে মিয়ানমারের অংশে চলে যাওয়ার কারণেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। ইতিপূর্বে টেকনাফের হ্নীলা সুøইসগেট সংলগ্ন নাফ নদে মাছ শিকারে যাওয়া জেলেদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে। এও জানা গেছে, নাফে মিয়ানমারের জলসীমা অতিক্রম করে সুযোগ পেলেই বাংলাদেশের জলসীমা ও বঙ্গোপসাগরের সঙ্গমস্থলে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও আরাকান আর্মির সদস্যরা ত্রাসের সৃষ্টি করছে। আমরা মনে করি, বিদ্যমান পরিস্থিতি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে অনতিবিলম্বে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করার পাশাপাশি সীমান্তে নজরদারি কঠোর করা জরুরি। জেলেদের নিরাপত্তায় বাড়তি নজর দেওয়ায় যৌথ টহল বাড়ানোর বিকল্প নেই। আমরা আরও দেখছি, নাফে ও সাগরে মাছ শিকার এখন জেলেদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। সবসময় তাদের মধ্যে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও আরাকান আর্মির আতঙ্ক কাজ করে। অপহৃত জেলেদের দ্রুত ফিরিয়ে আনতে জোরালো কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে সময়ক্ষেপণের অবকাশ আছে বলে আমরা মনে করি না।
আমাদের স্মরণে আছে, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে রক্তক্ষয়ী মর্মন্তুদ পরিস্থিতির মুখে প্রাণরক্ষায় দলে দলে যখন বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ শুরু করে তখন মিয়ানমারের জান্তা সরকার স্ববিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। এখন যে পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে তাতে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের সমন্বয়ে নাফ নদের বাংলাদেশ অংশে সার্বক্ষণিক কঠোর টহল বজায় রাখতে হবে, যাতে কোনো রাষ্ট্রীয় কিংবা সশস্ত্র গোষ্ঠী জলসীমা লঙ্ঘন করতে না পারে। জেলেদের জন্য বিশেষ কোড বা পাস এবং জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কোস্ট গার্ড ও বিজিবির আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে সীমান্ত অপরাধ কঠোরভাবে দমন করতে হবে। নিকট অতীতে মাছ ধরতে নাফ নদে নামতে না পারায় বাংলাদেশি জেলে এবং তাদের পরিবারের মধ্যে যে হাহাকার নেমে এসেছিল তা আমরা বিস্মৃত হইনি। মিয়ানমারে দীর্ঘদিনের নিপীড়ন এবং সাম্প্রতিক গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে আশ্রিত প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা যা ছিল একসময় জরুরি মানবিক বিষয় ছিল, তা এখন দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক সংকটে পরিণত হয়েছে। আর এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশি জেলেদের প্রকট নিরাপত্তাহীনতা। এর নিরসনে দুই দেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে তো বটেই, বিশ্বদরবারেও বিষয়গুলো নতুনভাবে উত্থাপনের বাস্তবতা ফের দেখা দিয়েছে। আমাদের জেলেদের নিজ দেশের জলসীমায় কেন নিরাপদে জীবিকা নির্বাহের পথ হয়ে থাকবে নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ?