ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশের আলেখারচর বিশ্বরোড পেরিয়ে শহরের দিকে এগোতেই নোয়াপাড়া পাসপোর্ট অফিসের সামনে স্থবির হয়ে পড়ে যানবাহনের গতি। সড়কজুড়ে বাসের দীর্ঘ সারি, যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামার হুড়োহুড়ি। শাসনগাছা বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি পৌঁছালে এই জট রূপ নেয় তীব্র যানজটে। মাত্র কয়েক মিনিটের পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে আধা ঘণ্টারও বেশি। ফলে প্রতিদিন কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানমুখী মানুষকে পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি।
কুমিল্লা উত্তর জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের শহরে প্রবেশের অন্যতম প্রধান পথ এই শাসনগাছা বাসস্ট্যান্ড। বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, দাউদকান্দি, হোমনা, মেঘনা, তিতাস, চান্দিনা ও মুরাদনগরসহ বিভিন্ন উপজেলার হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন এই পথ ব্যবহার করেন। তবে বাসস্ট্যান্ড ও সড়কের ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত পরিবহন চলাচল, যত্রতত্র বাস থামানো এবং অবৈধ বাসের কারণে পুরো এলাকায় দিন দিন জনদুর্ভোগ বাড়ছে।
বাংলাদেশ সেবামূলক ও পরিবহন খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লার ১৭টি উপজেলায় যাত্রী পরিবহনে সরকারি হিসাবে আন্তঃজেলা বাস চলে চার শতাধিক। তবে বাস্তবে রুট পারমিট ছাড়া আরও প্রায় দুই শতাধিক বাস চলাচল করছে। বছরের পর বছর এসব অবৈধ বাস চললেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
শাসনগাছা বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন প্রায় তিন শতাধিক বাস ছেড়ে যায়। বিআরটিএর তালিকা অনুযায়ী, শাসনগাছা থেকে মোট ৭টি পরিবহন সংস্থার বাস চলাচলের বৈধ অনুমতি রয়েছে। এগুলো হলো—পাপিয়া ট্রান্সপোর্ট (দাউদকান্দি রুটে ৯০টি), ফারহানা ট্রান্সপোর্ট (কোম্পানীগঞ্জ-নবীনগর রুটে ৩১টি), ফারজানা ট্রান্সপোর্ট (কোম্পানীগঞ্জ-মুরাদনগর রুটে ৩৯টি এবং বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া রুট), সততা সার্ভিস (মাধাইয়া-রহিমানগর রুটে ৪০টি), একতা সার্ভিস (গৌরীপুর-হোমনা রুটে ৩১টি) এবং সুগন্ধা সার্ভিস (মকিমপুর রুটে ৭টি)।
তবে অভিযোগ রয়েছে, এসব অনুমোদিত পরিবহনের বাইরেও ‘লাল সবুজ পরিবহন’, ‘রূপালী ট্রান্সপোর্ট’ ও ‘রয়েল ক্লাসিক এসি’ পরিবহনের ব্যানারে শতাধিক বাস দেবিদ্বার, মুরাদনগর ও গৌরীপুরসহ বিভিন্ন সড়কে অবৈধভাবে চলাচল করছে। এমনকি বৈধ পরিবহনগুলোও নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে বেশি গাড়ি রাস্তায় নামাচ্ছে।
অনুমতি না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে লাল সবুজ পরিবহনের পরিচালক এটিএম মিজানুর রহমান দাবি করেন, তারা হাইকোর্টের অনুমোদন নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন এবং বিআরটিএতে আবেদন করেছেন। তবে হাইকোর্টের আদেশের কোনো নথি তিনি দেখাতে পারেননি।
রূপালী ট্রান্সপোর্টের দায়িত্বে থাকা জাকির হোসেন পারভেজ বিআরটিএর অনুমোদন আছে দাবি করলেও সংস্থাটির কার্যালয় জানিয়েছে, রূপালী পরিবহনের কোনো রুট পারমিট নেই।
অন্যদিকে রয়েল ক্লাসিক এসি পরিবহনের প্রতিনিধি মো. জসিম বলেন, শাসনগাছায় অনেক বাসেরই পারমিট নেই। আমরা বিআরটিএতে আবেদন করেছি, আপাতত মালিক সমিতির অনুমোদন নিয়ে বাস চালাচ্ছি।
তবে মালিক সমিতির অনুমোদনে বাস চালানো অবৈধ বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন কুমিল্লা জেলা বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি জুলহিস আবদুর রব। তিনি বলেন, মালিক সমিতির কাউকে রুট পারমিট দেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। সমিতি অনুমোদন দিয়েছে বলে কেউ দাবি করলে তা সম্পূর্ণ ভুল।
এ বিষয়ে বিআরটিএ কুমিল্লার সহকারী পরিচালক ফারুক হোসেন বলেন, কয়েক একাধিক পরিবহনের আবেদনের বিষয় নিয়ে আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির (আরটিসি) সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কুমিল্লা জেলা প্রশাসক রোজি আক্তার বলেন, পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে রুট পারমিটের বাইরে কোনো গণপরিবহন চলতে দেওয়া হবে না। শিগগিরই আরটিসি সভা ডেকে রুট পারমিটহীন বাসের বিষয়ে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের মতে, কেবল রুট পারমিট দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সড়কের ধারণক্ষমতা ও বাসস্ট্যান্ডের অবকাঠামো বিবেচনা করে বাসের সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে। প্রশাসনিক তদারকি না বাড়লে শাসনগাছার এই যানজট নিরসন সম্ভব নয়।