দিন দিন ছাদকৃষি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। নগরীর ফাঁকা ছাদগুলো ধীরে ধীরে ভরে যাচ্ছে সবুজে। এখন আর শুধু সবজি নয়, ছাদকৃষিতে নানা ধরনের ফল উৎপাদনও সম্ভব হচ্ছে। বাজারে উন্নত জাতের কলমচারা পাওয়া যায়, যেগুলো অল্প সময়ে বড় হয়ে প্রচুর ফল দেয়। তবে প্রতিটি গাছের আলাদা চাহিদা এবং রোগবালাই সম্পর্কে জানা জরুরি। চলুন, জেনে নিই ছাদকৃষির কয়েকটি সাধারণ বিষয় যেগুলো ঠিক রাখলেই ছাদ হবে সবুজে ভরপুর আর ফলনে সমৃদ্ধ।
প্রাথমিক কাজ
প্রথমেই আপনাকে ঠিক করতে হবে কোন ফলের গাছ লাগাতে চান। এরপর নার্সারি থেকে উন্নত জাতের চারা সংগ্রহ করতে হবে। চারা সংগ্রহের সময় এর গঠন দেখতে হবে। টাকা একটু বেশি লাগলেও ভালো মানের গ্রাফটিং করা চারা কিনতে হবে। নার্সারি ছাড়া সরকারি হটিকালচার সেন্টারগুলোতেও চারা পাবেন।
সঙ্গে সঙ্গেই রোপণ নয়
চারা কিনে আনার সঙ্গে সঙ্গেই মাটিতে রোপণ করা ঠিক নয়। চারাগুলোকে আধো আলো-আধো ছায়ায় প্রায় ৭ দিন রেখে দিন। এ সময়ে কয়েকবার ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে। সাধারণত ১ লিটার পানিতে ২ গ্রাম ছত্রাকনাশক মিশিয়ে স্প্রে করা উত্তম। চারার মধ্যে যদি কোনো রোগবালাই থেকে থাকে, সেটি দূর হবে।
মাটি তৈরি
মাটি তৈরি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কারণ মাটি ভালোভাবে তৈরি হলে গাছও ভালো হবে।
প্রকৃতিতে গাছ মাটি থেকে অনেক উপাদান নিতে পারে। ছাদকৃষিতে সেই সুযোগ নেই। যে উপাদান দেওয়া হয়, তাই সে নিতে পারে। ৪০% বেলে-দো-আঁশ মাটি, ৩০% কেঁচো কিংবা গোবর সার, ১৫% কোকোপিট, বাকি ১৫%-এর মধ্যে থাকবে হাড়ের গুঁড়া, শিং কুচি, নিমের গুঁড়া, ডালো চুন, একটু বোরণ, একটু ছত্রাকনাশক প্রভৃতি। তবে মাটিতে ক্ষতিকর কার্বোফুরান ব্যবহার করবেন না। মাটিতে সব কিছু মিশিয়ে নিদেনপক্ষে ১৫ দিন রেখে দিন।
গাছ লাগানোর পাত্র
কী গাছ লাগাবেন, কত বড় গাছ লাগাবেন তার ওপর নির্ভর করে পাত্র। ফলের গাছের জন্য হাফ ড্রাম সবচাইতে ভালো। অনেক দিন টেকে। রঙ করে দিলে দেখতে সুন্দর লাগে। ড্রামের নিচে কয়েকটি ফুটো করে দিন। এগুলো দিয়ে পানি নেমে যাবে। ওই ফুটোর ওপরে ছালা কাটা, ইটের খোয়া দিতে পারেন। ইট দিয়ে তার ওপর পাত্র বসাবেন। পাত্রের মুখ থেকে মিনিমাম ১০ ইঞ্চি খালি রাখতে হবে। এটা পরে সার, মাটি দিয়ে আস্তে আস্তে ভরে উঠবে। যদি নিচ দিয়ে পানি না নামে তবে পাশে কয়েকটি ফুটো করে দিতে হবে। কোনোভাবেই গাছের গোড়ায় পানি জমতে দেওয়া যাবে না। গাছ লাগানোর পর গোড়ার মাটি একটুখানি উঁচু করে দিন।
শুরুটা অল্প দিয়েই হোক
শুরুতেই অনেক গাছ না কিনে মাত্র দুটি ফলের গাছ দিয়ে শুরু করা উত্তম। ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হলে গাছের সংখ্যা বাড়াতে পারেন। এখন তথ্যপ্রযুক্তির যুগ, আপনি যে গাছটি আনবেন, সেটি সম্পর্কে ইন্টারনেটে খোঁজ নিয়ে কিছুটা জেনে নিন। তবে সবচেয়ে ভালো হয় যদি পরিচিত কারও ছাদ বাগানে সরাসরি দেখে আসেন। এতে ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন।
অপেক্ষা করুন
ছাদকৃষিতে ফলের গাছের বয়স দুই বছর হওয়ার আগে ফুল এলেও তা ফেলে দিতে হবে। এতে গাছ শক্তিশালী ও সুস্থ হয়ে বেড়ে উঠবে। এ সময় ডালপালা ছেঁটে গাছকে ঝোপালো করতে হবে। দুই বছর পর থেকে গাছে ফল ধরতে দিন। এই বিষয়টি অবশ্যই মাথায় রাখা জরুরি, নইলে গাছ দুর্বল হয়ে যেতে পারে এবং ফলন কমে আসবে।
গাছের খাবার
ফলের গাছে বছরে অন্তত ২-৩ বার সার দেওয়া উচিত। এখানে খাবার বলতে বোঝানো হচ্ছে সার।
সারের ধরন : কেঁচো সার (অথবা ভালো মানের জৈব সার), ইউরিয়া, পটাশ, টিএসপি (TSP), এমওপি (MOP) গাছের বয়স ও আকার অনুযায়ী সারের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে। অল্প বয়সী চারায় কম পরিমাণে আর বড় গাছে তুলনামূলক বেশি সার ব্যবহার করতে হবে।
ভেষজ
বর্ষাকাল বাদে ছাদে একটা মাটির হাঁড়িতে সরিষার খৈল ভেজানোর ব্যবস্থা রাখবেন। সরিষার খৈল হলো গাছের বিরিয়ানি। মাসে অন্তত একবার সরিষার খৈল ভেজানো পানি দেবেন। সরিষার খৈলের সঙ্গে একটু বাদাম মিহিগুঁড়া করে দিলে বেশি ভালো। সবজির কাটাকুটির পর কাঁচা খোসা একেবারে গাছের গোড়ায় দেওয়ার যে চল দেখা যায়, এটা ঠিক নয়। সবজির খোসা পচিয়ে তারপর দিন। ভিজিয়ে সে পানি পাতলা করে দিতে পারেন। ক্যালসিয়ামের জন্য আস্ত ডিমের খোসা দেওয়াও একটা ভুল। এটা মাটিতে মিশতে যুগের পর যুগ লেগে যেতে পারে। ক্যালসিয়ামের জন্য ডালো চুন (Lime / Agricultural Lime) দেওয়া যেতে পারে।
গাছের দৈনিক পর্যবেক্ষণ
প্রতিদিন প্রতিটি গাছ ভালোভাবে লক্ষ করুন। কোনো অস্বাভাবিকতা যেমন পাতার রঙ পরিবর্তন, ডগা শুকিয়ে যাওয়া, পোকামাকড়ের আক্রমণ বা অন্য কোনো সমস্যা চোখে পড়লে দেরি করবেন না।
অভিজ্ঞদের দেখান অথবা ছবি তুলে ফেসবুকের ছাদকৃষি বিষয়ক গ্রুপে পোস্ট দিন। সেখানে অভিজ্ঞরা বিনামূল্যে সঠিক পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করবেন।
মিলিবাগ
ছাদকৃষিতে সবচেয়ে বড় শত্রু হলো মিলিবাগ। এগুলো দমনে হাতের কাছে ইমিটাফ কীটনাশক রাখুন। প্রয়োজনে মাঝে মধ্যে আগেভাগে স্প্রে করেও কোনো সমস্যা নেই। হালুদের গুঁড়া পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে পারেন। নিম কীটনাশক দিয়ে সব গাছ ভিজিয়ে দিন সপ্তাহে একবার।
ছাদকৃষি যেন বিষমুক্ত হয়
অনেকে চাইছেন ছাদকৃষিতে কীটনাশক ব্যবহার না করে ফল উৎপাদন করা। এজন্য কিছু প্রাকৃতিক ও নিরাপদ পদ্ধতি আছে ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনে : কয়েকটি হলুদ স্টিকি ফাঁদ ঝুলিয়ে দিন। চাইলে ফেরোমোন ফাঁদও ব্যবহার করতে পারেন।
পাতা ও গাছ পরীক্ষা : পানি দেওয়ার সময় পাতার ওপরে এবং নিচে ভালোভাবে স্প্রে করুন। পাতার নিচে হাত দিয়ে পরীক্ষা করুন, কোনো পোকা আছে কিনা।
এই নিয়ম মেনে চললে ছাদকৃষি হবে নিরাপদ ও বিষমুক্ত আর ফলনও ভালো থাকে।
ছাদকৃষিতে গাছের স্বাস্থ্য ও ফলন বৃদ্ধির ব্যবস্থা
অনুখাদ্য (Foliar Fertilizer) : গাছের জন্য একটি ভালো মানের অনুখাদ্য বাসায় রাখুন। মাঝে মধ্যে অনুখাদ্যকে পানিতে গুলে গাছে স্প্রে করুন।
ছত্রাকনাশক (Fungicide) : ছত্রাকের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে একটি ছত্রাকনাশক রাখা প্রয়োজন।
পিজিআর (Plant Growth Regulator) : গাছের ফল ও ফুলের ফলন বৃদ্ধি এবং গাছ যাতে ধরে রাখতে পারে, তার জন্য একটি পিজিআর ব্যবহার করুন। উদাহরণ : মিরাকুলান (Miraculan), প্রনোফিক্স প্রভৃতি।