রাশিয়ার তাতারস্তান অঞ্চলের শিল্পনগরী নিজনেকামস্কে ইউক্রেনের এক ভয়াবহ ড্রোন হামলায় শিশুসহ অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় পুরো তাতারস্তান অঞ্চলে এক দিনের শোক দিবস ঘোষণা করা হয়েছে।
আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, মস্কো থেকে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত এই শহরটিতে রবিবারের এই হামলায় আরও অন্তত ৩৯ জন আহত হয়েছেন। তাতারস্তানের প্রধান রুস্তম মিন্নিখানভ এই আক্রমণকে ‘বর্বরোচিত’ বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং জানান যে, ড্রোনগুলো বেসামরিক অবকাঠামোতে আঘাত হেনেছে।
উজবেকিস্তানের কাজানস্থ কনস্যুলেট নিশ্চিত করেছে যে, নিহত ১৩ জনের মধ্যে অন্তত ৭ জন উজবেক নাগরিক। উল্লেখ্য, মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে জনবহুল দেশ উজবেকিস্তানের ৩০ লাখের মতো মানুষ রাশিয়ায় কাজ করেন, যা দেশটির অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মস্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখার পাশাপাশি কিয়েভের আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন জানিয়ে এই যুদ্ধে একটি কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে উজবেকিস্তান।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা রাতভর ইউক্রেনের ৪৫০টিরও বেশি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। নিজনেকামস্ক শহরটি রাশিয়ার তেল রফতানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে দেশটির অন্যতম বৃহত্তম ও আধুনিক তেল শোধনাগার রয়েছে। ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা সফলভাবে সেই তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে।
রাশিয়ার তদন্ত কমিটির মুখপাত্র স্বেতলানা পেত্রেঙ্কো জানান, নিহতদের মধ্যে একটি শিশু রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, ইউক্রেন এমন সব শিল্প প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালিয়েছে, যাদের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর কোনো সম্পর্ক ছিল না। রাশিয়া এটিকে ‘সন্ত্রাসবাদী হামলা’ হিসেবে অভিহিত করে একটি ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিনিধি ইউলিয়া শাপোভালোভা মস্কো থেকে জানান, তাতারস্তানে শোক দিবস পালিত হচ্ছে। এর আগে চলতি বছরের জুন ও জুলাইয়েও এই একই শিল্পাঞ্চলে হামলা চালানো হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, ইউক্রেনের এই দীর্ঘপাল্লার ড্রোন হামলার মূল উদ্দেশ্য হলো রাশিয়ার জ্বালানি উৎপাদন পঙ্গু করে দেওয়া, সামরিক রসদ সরবরাহ ব্যাহত করা এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা ফুটিয়ে তুলে রাশিয়ার যুদ্ধ-অর্থনীতিকে ধ্বংস করা। এটি ছিল কিয়েভের চালানো অন্যতম বৃহৎ সমন্বিত দূরপাল্লার হামলা।
অন্যদিকে, ইউক্রেনের ড্রোন বাহিনীর অধিনায়ক মেজর রবার্ট ‘ম্যাগিয়ার’ ব্রোভদি বার্তা সংস্থা এপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ক্রিমিয়ায় তাদের সাম্প্রতিক হামলাগুলো একটি বড় সামরিক অভিযানের প্রথম ধাপ, যার উদ্দেশ্য হলো এই উপদ্বীপটিকে রুশ বাহিনীর ব্যবহারের অনুপযোগী করে তোলা। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে রাশিয়া বেআইনিভাবে ক্রিমিয়া দখল করে নিয়েছিল।
তিনি আরও জানান, প্রয়োজনীয় অস্ত্রের মাত্র ১৪ শতাংশ হাতে নিয়ে তারা এই অভিযান চালাচ্ছেন। পশ্চিমা মিত্রদের প্রতিশ্রুত অর্থ সহায়তা দ্রুত পেলে তারা ৭ গুণ বেশি হামলা চালাতে পারতেন। তবে এই ঘাটতি সত্ত্বেও গ্রীষ্মকালীন অভিযানে ইউক্রেনীয় বাহিনী ক্রিমিয়ার রেল সেতু, তেল ডিপো ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে রুশ সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এক বার্তায় সতর্ক করে বলেছেন, রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে তাদের হামলা অব্যাহত থাকবে এবং মস্কো ইতিমধ্যেই এর পরিণতি ‘টের পেতে শুরু করেছে’। তিনি রাশিয়াকে যুদ্ধ শেষ করতে অনিচ্ছুক বলে অভিযুক্ত করেন এবং চলতি সপ্তাহে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে শান্তি আলোচনার কথা জানান।
একই সময়ে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ অঞ্চলের একটি গ্রামে রাশিয়ার ‘ভয়াবহ কামান হামলায়’ অন্তত ৫ জন বেসামরিক লোক নিহত হয়েছেন। ইউক্রেনীয় প্রসিকিউটর কার্যালয় এই হামলাকে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ হিসেবে তদন্ত করছে।
রুশ হামলার কারণে ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ ওদেসা সমুদ্রবন্দর অচল হয়ে পড়েছে। দেশটির কৃষিমন্ত্রী তারাশ ভিসোৎস্কি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ওদেসা বন্দরে হামলার কারণে ২০২৬/২৭ মৌসুমে ইউক্রেনের শস্য রফতানি পূর্ব পূর্বাভাসের চেয়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। আগে যেখানে ৪ কোটি ৩০ লাখ টন রফতানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল, তা এখন কমিয়ে ৩ কোটি ৮০ লাখ থেকে ৪ কোটি টনে নামিয়ে আনা হয়েছে। সমুদ্রবন্দর অবরুদ্ধ থাকায় ইউক্রেনের কৃষি খাতে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র: আলজাজিরা