সাতছড়িতে পানি সংকট, লোকালয়ে আসতে পারে বন্যপ্রাণী

অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে বন্যপ্রাণীর পানির উৎস হিসেবে ব্যবহৃত তিনটি পুকুরের মধ্যে দুটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে আসা বিপুল পরিমাণ বালুতে পুকুর দুটি প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। একই সঙ্গে ছড়ার গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে বিভিন্ন স্থানে মাটি ও বালু সরে যাওয়াসহ জলাধারের পাড়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আগামী শুষ্ক মৌসুমের আগে এসব জলাধার পুনঃখনন ও সংস্কার করা না হলে বন্যপ্রাণীর তীব্র পানিসংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বন বিভাগ। পর্যাপ্ত পানি না পেলে বন্যপ্রাণী বনাঞ্চল ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসতে পারে। এতে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

সরেজমিন পরিদর্শন ও বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে রেঞ্জ অফিস, সার্ভে পিলার ও এক ঘণ্টা ট্রেইলসংলগ্ন এলাকায় মোট তিনটি পুকুর রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে বন্যপ্রাণীর পানির চাহিদা মেটাতে এসব পুকুর খনন করা হয়েছিল। সম্প্রতি অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সাতছড়ি রেঞ্জ অফিসসংলগ্ন এবং সার্ভে পিলারসংলগ্ন দুটি পুকুর ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোতে ছড়ার স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হওয়ায় পুকুর দুটির এক পাশের পাড় ভেঙে যায়। ফলে ঢলের পানি অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পাহাড় থেকে বিপুল পরিমাণ বালু এসে পুকুরে জমা হয়েছে। এতে পুকুর দুটি বর্তমানে প্রায় পানিশূন্য অবস্থায় রয়েছে। অন্যদিকে, এক ঘণ্টা ট্রেইলসংলগ্ন পুকুরটিতে বর্তমানে পানি জমা থাকলেও এর একাংশের পাড় ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুনরায় অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল হলে এ পুকুরটিও বালুতে ভরাট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে বন বিভাগ।

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান দেশের অন্যতম জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল। প্রায় ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৯৭ প্রজাতির পাখি এবং শতাধিক সরীসৃপ ও উভচরসহ বিপুল সংখ্যক বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রয়েছে বলে জানা গেছে। প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাওয়া ও বিরল-বিপন্ন প্রজাতির উল্লুক, মুখপোড়া হনুমান, চশমাপড়া হনুমান, মায়া হরিণ, হলুদগলা মার্টিন, লজ্জাবতী বানর, পাহাড়ি ময়না, সবুজ বোড়া ও কিং কোবরাসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর অন্যতম শেষ আশ্রয়স্থল এ বন। 

এ বিষয়ে সাতছড়ি বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ কর্মকর্তা এবং সহকারী বন সংরক্ষক মির্জা মেহেদী হাসান বলেন, সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পুকুরগুলো ভরাট ও পানিশূন্য হয়ে যাওয়ায় শীতকাল বা শুষ্ক মৌসুমে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হতে পারে। পর্যাপ্ত পানির অভাবে বন্যপ্রাণী বনাঞ্চলের বাইরে চলে গেলে মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে জলাধারগুলোতে পানির স্বল্পতার কারণে বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্যও বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সরেজমিনে আরও দেখা গেছে, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের গেট ও টিকিট কাউন্টারসংলগ্ন সুফল প্রকল্পের অর্থায়নে সম্প্রতি নির্মিত একটি ব্রিজের নিচ দিয়ে প্রবাহিত ছড়ায় অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোতে সাইড প্রোটেকশন গাইড ওয়াল ও সিসি ব্লক ভেঙে পড়েছে। এতে টিকিট কাউন্টারসংলগ্ন এলাকার সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ব্রিজটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) নির্মাণ করেছে। ইতোমধ্যে একটি পরিদর্শকদল সদ্য নির্মিত ব্রিজ ও এর আশপাশের এলাকা পরিদর্শন করেছে বলে জানা গেছে।

এ অবস্থায় সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে বন্যপ্রাণীর পানির চাহিদা নিশ্চিত করা এবং বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে পাহাড়ি ঢলে ভরাট হয়ে যাওয়া পুকুরগুলো পুনঃখনন, ক্ষতিগ্রস্ত পুকুরের পাড় পুনর্নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী হারুন এবং ধরিত্রীর জন্য আমরা (ধরা)-এর সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন সোহেল। 

তারা আরও বলেন, ভবিষ্যতে পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রয়োজনীয় কারিগরি সমীক্ষা করে স্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি টিকিট কাউন্টারসংলগ্ন ব্রিজের সাইড প্রোটেকশন গাইড ওয়াল ও ক্ষতিগ্রস্ত সিসি ব্লক দ্রুত পুনর্নির্মাণ করতে হবে।