যুক্তরাষ্ট্রের ধাক্কা ভুলে উয়েফায় ইতিহাস সেই সোমালিয়ান রেফারির

ভাগ্যের কী অদ্ভুত চিত্র! একদিকে যুক্তরাষ্ট্র সফরের স্বপ্নভঙ্গ আর অন্যদিকে ইউরোপিয়ান ফুটবলের এক অনন্য উচ্চতায় নাম লেখানো, সোমালিয়ান রেফারি ওমর আর্তানের জীবন এখন ঠিক এমনই এক নাটকীয়তার নাম।

যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের কড়াকড়ি ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে কিছুদিন আগে মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটকে যাওয়ার পর বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনার করার স্বপ্ন থমকে গিয়েছিল তার। তবে সেই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার ঠিক কয়েক দিনের মাথাতেই উয়েফা তাকে উপহার দিয়েছে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। অস্ট্রিয়ার সালজবুর্গস্ত রেড বুল অ্যারেনায় পিএসজি এবং অ্যাস্টন ভিলার মধ্যকার মর্যাদাপূর্ণ উয়েফা সুপার কাপের ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন ৩৪ বছর বয়সি এই সোমালিয়ান রেফারি। ইউরোপের এই ঐতিহ্যবাহী লড়াইয়ে প্রথম কোনো অ-ইউরোপীয় ম্যাচ অফিশিয়াল হিসেবে বাঁশি বাজিয়ে ইতিহাস গড়তে চলেছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনের সুযোগ না পাওয়ার সেই কঠিন সময়টা যে তার জন্য কতটা যন্ত্রণাদায়ক ছিল, তা সম্প্রতি উয়েফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অকপটে স্বীকার করেছেন আর্তান। গত ৬ জুন মায়ামি বিমানবন্দরে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। সোমালিয়া ট্রাভেল ব্যান বা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকায় ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোও ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছিলেন।

সেদিনের সেই দুঃসহ স্মৃতিচারণ করে আর্তান উয়েফাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “সেটা আমার জীবনের ভীষণ কঠিন এক সময় ছিল। বহু বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করার পর যখন কোনো বড় ইভেন্টে দায়িত্ব পালন করার কথা, আর ঠিক তখনই যদি আপনি সেখানে অংশ নিতে না পারেন, তবে তা অত্যন্ত হতাশাজনক ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়। তবে বিশ্বজুড়ে মানুষ আমার প্রতি যে সহমর্মিতা ও সমর্থন জানিয়েছে, তার জন্য আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ এবং সবার প্রতি আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই।”

হতাশার সেই কালো মেঘ কাটিয়ে সুপার কাপের ম্যাচ পাওয়ার পর তার অনুভূতি কেমন ছিল, সে কথাও জানাতে ভোলেননি সোমালিয়ার এই গর্বিত রেফারি। উয়েফার সঙ্গে ওই সাক্ষাৎকারে নিজের ও পরিবারের উচ্ছ্বাসের কথা প্রকাশ করে আর্তান বলেন, “যখন আমরা এই ম্যাচ পরিচালনার কলটি পেলাম, তখন বিষয়টি আমার এবং আমার পরিবারের জন্য অত্যন্ত আনন্দের এবং দারুণ এক মুহূর্ত ছিল। ইউরোপ ও অস্ট্রিয়ায় বিশাল সোমালি কমিউনিটি বাস করে এবং আমার এই ম্যাচ পরিচালনার খবরে তারা সবাই ভীষণ আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত।”

ম্যাচটির জন্য প্রস্তুতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে আর্তান জানান, সোমালিয়া এবং কুয়েত প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচ পরিচালনার মাধ্যমে তিনি নিজেকে সবসময় প্রস্তুত রেখেছেন। ম্যাচ পরিচালনার আগে দলগুলোর রণকৌশল নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেন তিনি। আর্তান বলেন, “আমরা রেফারিরা ম্যাচ শুরুর আগে দলগুলোর কার্যপদ্ধতি ও কৌশল জানার জন্য প্রচুর প্রস্তুতি নিই। আমি এমনিতেও ইউরোপীয় ফুটবল দেখতে পছন্দ করি, তবে পেশাগতভাবে দলগুলোর খেলার ধরন, তাদের আচরণ এবং ট্যাকটিকস নিয়ে আমি সবসময় গভীরভাবে গবেষণা করি।”

উয়েফা সুপার কাপের এই ঐতিহাসিক ম্যাচে আর্তানের সঙ্গে সহকারী হিসেবে থাকছেন আরও দুই আফ্রিকান রেফারি, জিবুতির লিবান আব্দুলরাজাক আহমেদ এবং কেনিয়ার স্টিফেন ইলেজার ওনিয়াংগো ইয়েম্বে। ফুটবলের রাজনীতির বেড়াজাল আর সীমানা পেরিয়ে মাঠের সততা ও কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে উমর আর্তানের এই ঘুরে দাঁড়ানো শুধু সোমালিয়া নয়, গোটা আফ্রিকান ফুটবল রেফারিদের জন্যই এক গর্বের মাইলফলক হয়ে থাকবে।