সভ্যতার ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছিল মাগুরায় আট বছরের শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা। শিশুটির সুস্থতা কামনায় দেশজুড়ে প্রার্থনা হয়েছিল, দোষীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমুলক বিচারের জন্য রাস্তায় নেমেছিল মানুষ।
ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে সংশোধন হয়েছিল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন। গত শনিবার সকালে মাগুরার আদালত এক রায়ে প্রধান আসামি শিশুটির বড় বোনের শশুর হিটু শেখকে প্রাণদণ্ডের আদেশ দিয়েছে। তবে, অপরাধের সংশ্লিষ্টতা না থাকায় অপর তিনজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এম জাহিদ হাসান জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় দেন।
এর আগে সকাল সাড়ে আটটায় কড়া নিরাপত্তায় আসামিদের কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়। গত ১৩ মে মামলার শুনানির সবশেষ ধাপ যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে রায়ের জন্য ১৭ মে দিন ধার্য করেছিল আদালত। বহুল আলোচিত এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে বিচার শুরুর ২১ দিনে এ রায় হলো।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ (২) ধারায় হিটু শেখকে সর্বোচ্চ এ সাজা দেয় আদালত। অন্যদিকে শিশুটির বোনের স্বামী সজীব শেখ, সজীবের ভাই রাতুল শেখকে দ-বিধির ৫০৬ ধারায় (ভয়ভীতি দেখানো) এবং বোনের শাশুড়ি জাহিদা বেগমকে দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় (আলামত গোপন) অভিযোগ আনা হলেও তা প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের খালাস দেয় আদালত।
এর মাধ্যমে ওই শিশুকে ধর্ষণের ঘটনার দুই মাস ১২ দিন, মৃত্যুর ৬৬ দিন, অভিযোগপত্র দাখিলের ৩৭ দিন, অভিযোগপত্র গ্রহণ করে বিচার শুরুর আদেশের ২৫ দিনে, সাক্ষ্য গ্রহণ শুরুর ২১ দিনে এবং ১৩ কার্যদিবস শুনানি নিয়ে আলোচিত এ ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার মামলায় রায় এলো। যদিও সকল আসামির শাস্তি না হওয়ায় রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শিশুটির মা। এছাড়া খালাসপ্রাপ্তদের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ রায় পর্যালোচনার পর উচ্চ আদালতে আপিলের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে ধর্ষণ মামলার এটি দ্বিতীয় দ্রুততম রায়। ২০২০ সালে ৩ অক্টোবর বাগেরহাটের মংলায় ৭ বছর বয়সী এক শিশুকে বিস্কুটের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আসামি করা হয় ৫৩ বছর বয়সী আব্দুল মান্নান সরকারকে। এরপর অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশের পর মাত্র সাত কার্যদিসব শুনানি নিয়ে ওই মাসের ১৯ অক্টোবর রায় দেয় বাগেরহাটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। রায়ে আব্দুল মান্নানকে যাবজ্জীবন কারাদ-াদেশ দেয় আদালত।
দেশে ধর্ষণ মামলার বিচার প্রক্রিয়া যথেষ্ঠ সময়সাপেক্ষ। তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দাখিল, অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ, সাক্ষ্য গ্রহণ, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থণ, যুক্তিতর্কের শুনানি- আইনের এই প্রতিটি স্তরে বছরের পর বছর সময় পেরিয়ে যায়। সাক্ষীর গড়হাজিরায় ভূক্তভোগীকে বিচার পেতে যথেষ্ঠ সংগ্রাম করতে হয়। যেজন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষণের মামলার আসামি খালাস পায় বলে বিভিন্ন মাধ্যমে উঠে এসেছে। তবে, গতকাল মাগুরায় এ ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায়টি দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি বিরল নজির এবং প্রণিধানযোগ্য বলে মনে করেন ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞরা।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারার বিধান অনুযায়ী, অধস্তন আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় হলে তা কার্যকরে উচ্চ আদালতের অনুমোদন ও শুনানির প্রয়োজন হয়। এজন্য অধস্তন আদালতের রায়ের অনুলিপি ও মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হলে এটি ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) হিসেবে নথিভূক্ত এবং শুনানির জন্য পেপারবুক (মামলার রায়সহ যাবতীয় নথি) প্রস্তুত হয়। পাশাপাশি কারাগারে থাকা আসামি হাইকোর্টে আপিলের সুযোগ পান। সাধারণত ডেথ রেফারেন্স মামলা হাইকোর্টের কার্যতালিকায় আসে ক্রমানুসারে। তবে, আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর মামলার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারভিত্তিতে পেপারবুক তৈরি ও শুনানির অনেক নজির রয়েছে।
তিন আসামির খালাসে সন্তুষ্ট নন শিশুটির মা:
মাগুরার আলোচিত শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় প্রধান আসামির মৃত্যুদণ্ড হলেও বাকি তিন আসামির খালাসে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা যাওয়া শিশুটির মা। গতকাল রায়ের প্রতিক্রিয়ায় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘খুশি হবো কী করে, ওরা তিনজনই জানতো, ওরা আমার বড় মেয়েকে হুমকি দিয়ে প্রচুর মারধর করেছে। ওরা আজকে আমার মেয়ের সাথে এমন আচরণ করেছে কাল ছাড়া পেয়ে অন্য কোথাও করবে। আমি এই রায়ে সন্তুষ্ট হইনি।’ শিশুটির মা আরও বলেন, তারা কীভাবে খালাস পেয়ে গেল? ওরাও তো দোষী। আমি চাই, ওদেরও শাস্তি হোক। আমি হাইকোর্টে যাব, যাতে ওই তিনজনেরও শাস্তি হয়।’
পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে খালাসপ্রাপ্তদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত:
রাষ্ট্রপক্ষে এ মামলায় শুনানি করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্পেশাল প্রসিকিউটর অ্যাডভাইজার অ্যাডভোকেট এহসানুল হক সমাজী ও কৌঁসুলি মনিরুল ইসলাম মুকুল। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় অ্যাডভোকেট এহসানুল হক সমাজী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার কারণে বাংলাদেশে ও বর্হিবিশ্বে প্রতিবাদের ঝড় ওঠেছিল। মানুষ ন্যায় বিচার চেয়েছে। সকলের সহযোগিতায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই মামরাটি নিষ্পত্তি করেছেন যা একটি বিরল ইতিহাস হয়ে থাকবে।
এই মামলার রায়ের মাধ্যমে এবং দ্রুততম সময়ে বিচারের মাধ্যমে একটি বার্তা সকলের জন্য প্রনিধানযোগ্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীন বিচার ব্যবস্থায় বিচারিক আদালত তাঁর জুডিসিয়াল মাইন্ড অ্যাপ্লাই করে অ্যাভিডেন্স অন রেকর্ডের উপরে এই রায় দিয়েছেন। আসামী হিটু শেখের বিরুদ্ধে আদালত যে রায় দিয়েছেন তাতে আমরা সন্তষ্ট। কিন্তু খালাসের বিষয়ে রায়ের কপি সংগ্রহ করে পরে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। প্রয়োজনে উচ্চ আদালতে আপিল করবো।’
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম মুকুল গণমাধ্যমকে বলেন, মূল আসামিকে মৃত্যুদ- দেওয়ায় আমরা সন্তুষ্ট। অন্য তিনজনকে কেন খালাস দেওয়া হয়েছে, তা পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর পর্যালোচনা করে উচ্চ আদালতে আপিলের বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আসামিপক্ষের আইনজীবী (লিগ্যাল এইড) সোহেল আহম্মেদ গণমাধ্যমকে বলেন, তিন আসামিকে খালাস দেওয়ায় আমরা খুশি। আর মূল আসামির মৃত্যুদ-ের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে কি না, তা তার পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হবে বলে জানান তিনি।
যেভাবে দেশকে নাড়িয়ে দেয় ঘটনাটি:
১ মার্চ মাগুরায় বোনের বাড়ি বেড়াতে যায় তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ওই শিশুটি। গত ৬ মার্চ বৃহস্পতিবার ভোরে মাগুরা শহরের নিজনান্দুয়ালী এলাকায় ধর্ষণের শিকার হয় সে। প্রথমে মাগুরা সদর হাসপাতাল এরপর অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। এরপর ৮ মার্চ তাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসাপাতালে (সিএমএইচ) প্যাডিয়াট্রিক আইসিইউতে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তার শরীরে অসংখ্য নির্যাতনের ক্ষত ছিল। গণমাধ্যমে এই শিশুর বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর শিশুটিকে সুস্থ করে তুলতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে চেষ্টা হয়। কিন্তু সঙ্কটাপন্নে থাকা এই শিশুর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল না। জীবন মৃত্যুর লড়াইয়ে থাকা শিশুটির জন্য কয়েকদিন পথে নেমেছিল ছাত্র, শিক্ষক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার লাখো মানুষ। ধর্ষকদের দ্রুত সর্বোচ্চ বিচারের দাবিতে মুখর হয় সারাদেশ। এরই মধ্যে ১৩ মার্চ দুপুর ১টার পরে আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, মাগুরায় নির্যাতিত শিশুটি মারা গেছে।
এই ঘটনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস আসামিদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সরকারের একাধিক উপদেষ্টা ও পুলিশের পক্ষ থেকে দ্রুত তদন্ত ও বিচারের আশ্বাস দেওয়া হয়। ওই দিন সামরিক বাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে শিশুটির মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় মাগুরায় তার নিজ গ্রামে। দুই দফা জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়।
দেশজুড়ে তীব্র আন্দোলন ও বিক্ষোভের মধ্যে সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করে। এতে ধর্ষণের মামলায় তদন্তের সময় ৩০ থেকে কমিয়ে ১৫ দিন এবং অভিযোগ গঠনের পর বিচার শেষ করতে ৯০ দিন সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি উপযুক্ত ক্ষেত্রে ডিএনএ প্রতিবেদন ছাড়া চিকিৎসা সনদের ভিত্তিতে এবং পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বিচারক মামলার বিচারকাজ চালাতে পারবেন- এমন বিধান রাখা হয় সংশোধিত আইনে। এর ধারাবাহিকতায় শিশুটির মৃত্যুর দুই মাস চারদিনের মাথায় নৃশংস এ ধর্ষণ ও হত্যাকান্ডে অধস্তন আদালতের রায় ঘোষণা হলো।
যেভাবে বিচার প্রক্রিয়া শুরু ও শেষ:
নির্মম এই ঘটনায় শিশুটির মা ৮ মার্চ মাগুরা সদর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। পরে এ মামলাটি ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় রূপান্তরিত হয়। মামলায় শিশুটির বড় বোনের শ্বশুর হিটু শেখ শাশুড়ি জাহিদা বেগম, বড় বোনের স্বামী সজীব শেখ ও ভাসুর রাতুল শেখকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ডিএনএ পরীক্ষায় শিশুটিকে ধর্ষণের ঘটনায় হিটু শেখের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়।
ঘটনার পর ১৫ মার্চ আদালতে দোষ স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দেন প্রধান আসামি হিটু শেখ। ৩৭ দিন তদন্ত শেষে গত ১৩ এপ্রিল আদালতে অভিযোগপত্র দেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মাগুরা সদর থানার পরিদর্শক মো. আলাউদ্দিন। ২০ এপ্রিল অভিযোগপত্র গ্রহণ করে আদালত। ২৩ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচারকাজ শুরুর আদেশ হয়। ২৭ এপ্রিল শুরু হয় সাক্ষ্য গ্রহণ। বিচারকালে রাষ্ট্রপক্ষে ২৯ সাক্ষী সাক্ষ্য দেন।
যা বলছেন মাগুরার স্থানীয়রা:
দেশব্যাপী আলোচিত মাগুরার চাঞ্চল্যকর ৮ বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন মাগুরার বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। তবে প্রধান আসামির রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানান তারা। জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শাহেদ হাসান টগর বলেন, একটি নিষ্পাপ শিশুর উপর যেভাবে মধ্যযুগীয় কায়দায় অমানবিক পাশবিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে তার জন্য আসামির সাজা দৃষ্টান্তমূলক অনুকরনীয় হয়ে থাকবে। বিচারাঙ্গনে এই রায় দৃষ্টান্তমূলক হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।
আইনজীবী চাদ সুলতানা বলেন, হিটু শেখের ফাঁসির রায়ে আমরা মাগুরাবাসী সন্তুষ্টি প্রকাশ করছি। এ রকম দ্রুত বিচার পেলে এ ধরণের ঘৃণ্য কাজের কথা অপরাধীরা তাদের চিন্তায় আনতে পারবে না। তবে, তিন আসামির খালাসে আমরা শঙ্কিত। শহরের ব্যবসায়ী শাহ আলম বলেন, এই রায়ের মাধ্যমে মাগুরাবাসী কলঙ্কমুক্ত হলো। আশা করি এ রায় দ্রুত কার্যকর হবে।