অভিবাসন কড়াকড়ির অংশ হিসেবে লাখ লাখ বিদেশি নাগরিকের ভিসা বাতিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৫ সালে ১ লাখের বেশি ভিসা বাতিল করেছিল তার প্রশাসন। চলতি বছর আরও প্রায় ৭৫ হাজার ভিসা বাতিল হয়েছে। গত সোমবার দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশ করা একটি বিজ্ঞপ্তি থেকে এ তথ্য জানা গেছে। উথ চায়না মর্নিং পোস্টকে পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র জানান, ভিসা বাতিলের বর্তমান গতি বজায় থাকলে চলতি বছরই আগের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যাবে। দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যারা ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করেছেন, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতার উস্কানি দিয়েছেন, প্রতারণা করেছেন, অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার করেছেন কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছেন মূলত তাদেরই ভিসা বাতিল করা হয়েছে।
ভিসা বাতিলের এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান কারণ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑকাউকে আঘাত বা হামলা করা, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, চুরি এবং মাদকসংক্রান্ত অপরাধ। এ ছাড়া বেপরোয়া গাড়ি চালানো, যৌন নিপীড়ন, শিশু নির্যাতন, জালিয়াতি এবং অর্থ আত্মসাতের মতো অপরাধের কারণেও বিপুলসংখ্যক ভিসা বাতিল করা হয়েছে। পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার নিয়মিতভাবে ভিসা পাওয়া ব্যক্তিদের তথ্য যাচাই-বাছাই করে থাকে। এই ভিসা বাতিলগুলো সেই নিয়মিত প্রক্রিয়ারই অংশ। এর মূল লক্ষ্য হলোÑভিসাধারীরা নিয়ম মেনে চলছেন কি না এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য কোনো হুমকি কি না, তা নিশ্চিত করা। তবে ভিসা বাতিল হওয়া ব্যক্তিদের ধরন বা দেশের কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি। এতে কেবল তাদের ‘বিদেশি নাগরিক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর নাগরিকসহ বেশ কিছু ঘটনার কথা বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়, যার মধ্যে ইরানি, কুয়েতি, কিউবান এবং লাওতিয়ান নাগরিকদের মতো যেসব অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো সম্ভবÑ এমন মামলাগুলোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। চলতি বছর জানুয়ারিতে ওয়াশিংটন জানিয়েছিল, ২০২৫ সালে ভিসা বাতিল হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিল প্রায় ৮ হাজার শিক্ষার্থী এবং বিশেষায়িত পেশায় নিয়োজিত ২ হাজার ৫০০ জন কর্মী।
অ্যাডভান্সিং জাস্টিসের ইমিগ্রেশন অ্যাডভোকেসি বিভাগের পরিচালক মার্টিন কিম বলেন, ভিসা বাতিলের এসব সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়ার অংশ। অভিবাসী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আসা এবং বসবাস করা পুরোপুরি অসম্ভব করে তুলতেই এটি তৈরি করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, অভিবাসী কিংবা যারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পেয়েছেন সবার জন্যই অত্যন্ত প্রতিকূল ও অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করা এদের মূল লক্ষ্য। কিম উল্লেখ করেন, অনেক অভিবাসী তরুণ বয়সে হয়তো আইনি জটিলতা বা অপরাধের মুখোমুখি হয়েছিলেন, কিন্তু পরবর্তী সময়ে তারা নিজেদের শুধরে নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তার মতে, ট্রাম্প প্রশাসন জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নয়, বরং অতীতে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার যেকোনো ঘটনাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর এমন আক্রমণ চালাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, কারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হতে পারবে আর কারা পারবে না এমন সেকেলে ও বৈষম্যমূলক ধারণার ওপর ভিত্তি করেই বর্তমান প্রশাসন এসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
বার্থ ট্যুরিজমের বিরুদ্ধে কড়াকড়ি : যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের একটি দূতাবাস থেকে ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বা জন্মভিত্তিক নাগরিকত্ব ভ্রমণের অভিযোগে শতাধিক ভিসা বাতিল করা হয়েছে। প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দিয়ে নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে সফর করা অভিভাবকদের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সম্প্রতি জন্মভিত্তিক নাগরিকত্ব সুবিধা সীমিত করার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দুটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষরের পরই এ সংক্রান্ত ভিসা বাতিলের তথ্য প্রকাশ পেল। জন্মসূত্রে নাগরিকত্বসংক্রান্ত সাংবিধানিক অধিকার বহাল রেখে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ট্রাম্প প্রশাসন এই পদক্ষেপ নিল। নতুন আদেশগুলোর একটির অধীনে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা ভিসা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া আরও জোরদার করেন এবং বার্থ ট্যুরিজমের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন চক্রগুলোর বিরুদ্ধে যেন তদন্ত হয়।