সাতক্ষীরা কারাগার থেকে বন্দী পলায়ন

২ বছর পর দুই পলাতক গ্রেপ্তার, এখনো অধরা ৩৯ আসামি

৫ আগস্ট ২০২৪—সরকার পতনের দিন সন্ধ্যায় সাতক্ষীরা জেলা কারাগারের ফটক ভেঙে বেরিয়ে গিয়েছিলেন ৮৭ বন্দী। কেউ ফিরে এসেছিলেন, কেউ ধরা পড়েছেন পরে; তবে ৩৯ জন এখনো অধরা। এরই মধ্যে ঘটনার প্রায় দুই বছর পর শ্যামনগরের দুটি পৃথক অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন আরও দুই পলাতক বন্দী।

মঙ্গলবার রাতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে শ্যামনগর থানা-পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন উপজেলার ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের শ্রীফলকাটি গ্রামের মোজাম গাজী (৪৯) ও আটুলিয়া ইউনিয়নের নওয়াবেকি গ্রামের রফিকুল ইসলাম গাজী (৩৮)।

শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাফিউল ইসলাম পাটোয়ারী বলেন, কারাগার থেকে পালানোর পর দুজনই নিজ নিজ এলাকায় আত্মগোপনে ছিলেন। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পৃথক অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বুধবার তাদের আদালতে পাঠানো হবে। অন্য পলাতকদের গ্রেপ্তারেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সাতক্ষীরা জেলা কারাগারের জেলার মনির হোসেন জানান, ওই ৮৭ জনের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ৪৬ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ফিরেছেন। বর্তমানে ৩৯ জন পলাতক। তাদের নামের তালিকা স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে দেওয়া হয়েছে।

এই তালিকায় রয়েছেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি—সাতক্ষীরা সদরের সাহেব আলী ও ভাড়ুখালীর শাহাদাৎ হোসেন। হত্যা মামলার আসামি হিসেবে বন্দী ছিলেন তালার আসমা বেগম ও আমিরুল ইসলাম, কলারোয়ার আবদুল আলিম এবং শ্যামনগরের শফিকুল ইসলাম। বাকিরা মাদক, নারী ও শিশু নির্যাতন, মারপিটসহ বিভিন্ন মামলায় কারাগারে ছিলেন।

পুলিশ ও আদালতের নথি অনুযায়ী, মোজাম গাজী চেক ডিজঅনারের একটি মামলায় এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ছয় লাখ টাকা জরিমানা পেয়েছিলেন। কারাগার থেকে পালানোর পর তার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর সাজা পরোয়ানা জারি হয়। একই ধরনের মামলায় রফিকুল ইসলাম গাজীর ১০ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা জরিমানা হয়েছে।

কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, ৫ আগস্ট ২০২৪ সাতক্ষীরা জেলা কারাগারে বন্দী ছিলেন ৫৯৬ জন। ওই সন্ধ্যায় হামলা ও ভাঙচুরের সময় প্রধান ফটকসহ বিভিন্ন বন্দিশালার দরজা ভেঙে দিলে বিপুলসংখ্যক বন্দী বেরিয়ে যান। পরে অনেকে রাতেই এবং পরদিন কারাগারে ফিরে আসেন। কিন্তু ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ফিরে না আসা ৮৭ জনের বিরুদ্ধে কারাগার ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে মামলা করা হয়।

পলাতকদের দীর্ঘদিন ধরেও গ্রেপ্তার না হওয়াকে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে দেখছেন না মানবাধিকারকর্মীরা। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের জেলা কমিটির সদস্য সচিব ও সাতক্ষীরার মানবাধিকারকর্মী এডভোকট মুনির উদ্দিন বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও গুরুতর অপরাধের মামলার আসামিরা দীর্ঘদিন বাইরে থাকায় নতুন করে অপরাধ বা অশান্তি তৈরির আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্ট মামলার বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়।

জেলা পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম বলেন, ৩৯ পলাতকের অবস্থান শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তারা কোথায় অবস্থান করছেন এবং কারও সহযোগিতায় আত্মগোপনে আছেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আইনের হাত থেকে পলাতক বন্দীদের পার পাওয়ার সুযোগ নেই।

দুই বছর পর দু’জন গ্রেপ্তার হলেও সাতক্ষীরা কারাগার থেকে পালানোর সেই ঘটনার হিসাব এখনো পুরোপুরি মেলেনি—অধরা ৩৯ জনকে ঘিরে রয়ে গেছে সেই প্রশ্ন।