লুভরের মোনালিসা, ব্রিটিশ মিউজিয়ামের রোসেটা স্টোন কিংবা নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টের ‘স্টারি নাইট’, বিশ্বের বড় জাদুঘরগুলোর এমন কিছু নিদর্শন থাকে, যা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন দর্শনার্থীরা।
তাইওয়ানের রাজধানী তাইপের ন্যাশনাল প্যালেস মিউজিয়ামের সবচেয়ে আকর্ষণীয় নিদর্শনগুলোর একটি অবশ্য একটু অন্যরকম, একটি বাঁধাকপি।
সাদা ও সবুজ রঙের জেড পাথর কেটে তৈরি করা হয়েছে বাঁধাকপিটির অবয়ব। এতটাই নিখুঁতভাবে এটি খোদাই করা যে দেখে মনে হয়, সদ্য ক্ষেত থেকে তুলে আনা তাজা বাঁধাকপি, পাতায় এখনো যেন সকালের শিশির লেগে আছে। পাতার ফাঁকে দেখা যায় একটি ঘাসফড়িং ও একটি পঙ্গপাল। জেড পাথরের প্রাকৃতিক দাগ ও রঙের বৈচিত্র্যকেও দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছেন অজ্ঞাত সেই শিল্পী।
কাঠের একটি স্ট্যান্ডের ওপর রাখা এই শিল্পকর্মটির উচ্চতা মাত্র ৭ দশমিক ৪ ইঞ্চি। অথচ এর জনপ্রিয়তা এতটাই বেশি যে জাদুঘরে এর জন্য আলাদা প্রদর্শনী কক্ষ রয়েছে। কখন এই ‘বাঁধাকপি’ অন্য কোথাও প্রদর্শনের জন্য নিয়ে যাওয়া হবে, সেটিও আগেভাগে জানিয়ে দেয় জাদুঘর, যাতে দর্শনার্থীরা এসে হতাশ না হন।
প্রতি বছর ন্যাশনাল প্যালেস মিউজিয়ামে প্রায় ২০ লাখ মানুষ ঘুরতে আসেন। তাদের কতজন শুধু জেড বাঁধাকপি দেখতে আসেন, তার হিসাব নেই জাদুঘরের কাছে। তবে ছবি তোলার জন্য দর্শনার্থীদের দীর্ঘ সারিই বলে দেয়, সংখ্যাটি কম নয়।
চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে আসা পর্যটক ক্লোয়ি ওয়াং বলেন, ছবিতে বাঁধাকপিটিকে যতটা আকর্ষণীয় মনে হয়, বাস্তবে নিজের চোখে দেখলে এটি আরও বেশি সুন্দর।
তাইওয়ানে অনেকেই এটিকে ‘জাতীয় সম্পদ’ বলে থাকেন। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এটি জাতীয় সম্পদ হিসেবে স্বীকৃত নয়। জাদুঘরের দোকান থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় এই বাঁধাকপির ছবি, খেলনা ও প্রতিকৃতি বিক্রি হয়।
সম্রাটের প্রাসাদ থেকে তাইওয়ানে
জেড বাঁধাকপিটি ন্যাশনাল প্যালেস মিউজিয়ামের অধিকাংশ সংগ্রহের মতোই চীনের রাজপরিবারের পুরোনো নিদর্শন। একসময় এটি বেইজিংয়ের নিষিদ্ধ নগরী বা ফরবিডেন সিটিতে রাখা ছিল। চীনের গৃহযুদ্ধের সময় অন্যান্য বহু রাজকীয় নিদর্শনের সঙ্গে এটিও তাইওয়ানে নিয়ে আসা হয়।
তবে জেড দিয়ে তৈরি বাঁধাকপি শুধু এটিই নয়। বেইজিংয়ের প্যালেস মিউজিয়াম ও চীনের তিয়ানজিন মিউজিয়ামেও জেডের তৈরি বাঁধাকপি রয়েছে। তাইপের জাদুঘরেও এমন আরও দুটি বাঁধাকপির ভাস্কর্য আছে।
তাহলে এই বাঁধাকপিটিই কেন এত বিখ্যাত?
ন্যাশনাল তাইওয়ান ইউনিভার্সিটির শিল্প ইতিহাসের অধ্যাপক সু ইয়া-হুইয়ের মতে, জেড পাথরের ঝলমলে রং এবং শিল্পীর অসাধারণ কারুকাজ এটিকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে।
তবে শুধু শিল্পমান নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রতীকী অর্থও এর জনপ্রিয়তার বড় কারণ বলে মনে করা হয়।
ধারণা করা হয়, ১৮৮০-এর দশকে চীনের গুয়াংসু সম্রাটের এক স্ত্রীকে দেওয়া যৌতুকের অংশ ছিল এই শিল্পকর্ম। সেই কারণে দীর্ঘদিন ধরে এটি নারীর পবিত্রতা, উর্বরতা ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
যদিও কিছু ইতিহাসবিদ প্রশ্ন তুলেছেন, পাতার মধ্যে থাকা পঙ্গপাল ও ঘাসফড়িং আদৌ সন্তান বা বংশবৃদ্ধির প্রতীক কি না, কিংবা এটি সত্যিই যৌতুক হিসেবে দেওয়া হয়েছিল কি না। তবু এসব ধারণা মানুষের কল্পনাকে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করেছে।
ইতিহাসের সূত্র খুবই কম
১৯১২ সালে চীনে কিং রাজবংশের পতনের পর ফরবিডেন সিটিতে একটি রঙিন এনামেলের পাত্রের মধ্যে জেড বাঁধাকপিটি পাওয়া যায়। পরে এটি বেইজিংয়ের প্যালেস মিউজিয়ামে প্রদর্শন করা হয়।
১৯২৮ সালে প্রথমবার প্রদর্শনের সময় বাঁধাকপিটিকে পাত্র থেকে আলাদা করে রাখা হয়। জাদুঘরের কর্মকর্তারা মনে করেছিলেন, এতে শিল্পকর্মটি আরও আকর্ষণীয়ভাবে দেখা যাবে। দর্শনার্থীদের মধ্যেও এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
১৯৩০-এর দশকে জাপানের সামরিক বাহিনীর হাতে রাজকীয় নিদর্শনগুলো চলে যাওয়ার আশঙ্কায় চীনের বিভিন্ন স্থান থেকে এসব সম্পদ সরিয়ে নেওয়া শুরু হয়। অনেক নিদর্শন মন্দির, গুহা ও বিভিন্ন নিরাপদ স্থানে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।
চীনের গৃহযুদ্ধে মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট বাহিনী জয়ী হওয়ার পর পরাজিত রিপাবলিকান সরকার হাজার হাজার বাক্সে করে বিপুলসংখ্যক ঐতিহাসিক নিদর্শন তাইওয়ানে নিয়ে যায়। জেড বাঁধাকপিও ছিল সেই সংগ্রহের অংশ।
তাইপের ন্যাশনাল প্যালেস মিউজিয়াম বর্তমানে প্রায় ৭ লাখ ঐতিহাসিক নিদর্শনের সংগ্রহশালা। ১৯৬৫ সালে বর্তমান ভবনে জাদুঘরটি চালু হয়।
১৯৬৮ সালে তাইওয়ানের ডাক বিভাগ জেড বাঁধাকপির ছবি দিয়ে একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে। এর ৩৫ লাখ কপি ছাপা হয়েছিল। এতে সাধারণ মানুষের কাছে বাঁধাকপিটির পরিচিতি আরও বেড়ে যায়।
‘তিন রত্নের’ একটি
জেড বাঁধাকপিকে প্রায়ই ন্যাশনাল প্যালেস মিউজিয়ামের ‘তিন রত্নের’ একটি বলা হয়। অন্য দুটি হলো মাংসের মতো দেখতে পাথরের ভাস্কর্য ‘মিট-শেপড স্টোন’ এবং প্রাচীন চীনা অক্ষরের দীর্ঘতম লেখাযুক্ত ব্রোঞ্জের পাত্র ‘মাও কুং টিং’।
পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে তিনটি নিদর্শনকে মজা করে ‘আচার দেওয়া বাঁধাকপি, মাংস ও হটপট’ নামেও পরিচয় করিয়ে দেন গাইডরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব নিদর্শনের সাধারণ ও পরিচিত চেহারাও তাদের জনপ্রিয়তার একটি কারণ। বাঁধাকপির মতো পরিচিত একটি বস্তু সাধারণ মানুষকে রাজকীয় ইতিহাসের সঙ্গে সহজেই যুক্ত করে।
তবে শিল্প ইতিহাসবিদদের কাছে জেড বাঁধাকপিটি অনন্য হলেও এটি একমাত্র অসাধারণ চীনা শিল্পকর্ম নয়। কিং রাজবংশের সময় এ ধরনের বাস্তবধর্মী জেড খোদাই বেশ প্রচলিত ছিল।
আরেকটি সমস্যা হলো, এই বাঁধাকপির ইতিহাস সম্পর্কে লিখিত তথ্য খুবই কম। কে এটি তৈরি করেছিলেন, কার নির্দেশে তৈরি হয়েছিল এবং কার মালিকানায় ছিল, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
শিল্প ইতিহাসবিদ সু ইয়া-হুই বলেন, এই শিল্পকর্ম নিয়ে বিস্তারিতভাবে বলার মতো ঐতিহাসিক সূত্র খুব বেশি নেই। হয়তো ভবিষ্যতে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
এ কারণেই তাইওয়ানের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এটিকে পূর্ণাঙ্গ ‘জাতীয় সম্পদ’ না দিয়ে ‘গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন নিদর্শন’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে।
জাদুঘরের সাবেক গবেষক ওয়াং শাও-চুনের মতে, বাঁধাকপিটির জনপ্রিয়তা ও ঐতিহাসিক মূল্য একেবারেই সমানুপাতিক নয়। অনেকটা সিনেমার মতো—জনপ্রিয় সিনেমা মানেই সেরা শিল্পকর্ম নয়, আবার সেরা শিল্পকর্মও সবসময় সবচেয়ে জনপ্রিয় হয় না।
নিরাপত্তায় বিশেষ নজর
জনপ্রিয়তার কারণে জেড বাঁধাকপিটির নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নেয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। ভূমিকম্পপ্রবণ তাইওয়ানে আকস্মিক কম্পনে যাতে এটি পড়ে না যায়, সে জন্য শক্তিশালী কাচের বাক্সের ভেতরে রাখা হয়েছে। বিশেষ সুতো দিয়ে সেটিকে স্থির করে রাখা হয়।
অন্য কোথাও প্রদর্শনের জন্য নিয়ে যাওয়ার সময়ও নেওয়া হয় বাড়তি নিরাপত্তা। বিশেষ বাক্সে রেখে সেটি আবার কাঠের বাক্সে ভরা হয়। বিমানবন্দর পর্যন্ত সাধারণত পুলিশ ও জাদুঘরের বিশেষ কর্মীরা এর সঙ্গে থাকেন।
বিদেশে প্রদর্শনের জন্যও খুব কমই পাঠানো হয় এই শিল্পকর্ম। ২০১৪ সালে জাপানে প্রদর্শনের পর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ২০২৫ সালের আগস্টে এটি চেক প্রজাতন্ত্রে পাঠানো হয়। তাইওয়ানের প্যালেস মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১৩০টির বেশি নিদর্শনের সঙ্গে জেড বাঁধাকপিটিও প্রদর্শনীতে অংশ নেয়।
তাইওয়ানের সঙ্গে চেক প্রজাতন্ত্রের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার বিষয়টি চীনের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কের অবনতির সঙ্গে মিলে যাওয়ায় বেইজিং এ প্রদর্শনীর সমালোচনা করে। চীন তাইওয়ানের এমন উদ্যোগকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ড’ বলে আখ্যা দেয়। তাইওয়ানের সরকার ও জাদুঘর কর্তৃপক্ষ অবশ্য অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এটিকে ‘সাংস্কৃতিক বিনিময়’ হিসেবে উল্লেখ করে।
প্রদর্শনী চলাকালে অজ্ঞাতপরিচয় একটি ই-মেইলে অগ্নিসংযোগ, চুরি, গুলিবর্ষণ ও সন্ত্রাসী হামলার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। এরপর জাদুঘর কর্তৃপক্ষ চেক কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলে নিরাপত্তা আরও জোরদার করে।
তবু প্রদর্শনী বন্ধ হয়নি। বরং চেক দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে ছোট্ট জেডের বাঁধাকপিটি।
প্রদর্শনীর কিউরেটর ওন্দ্রেশ ক্রহাক বলেন, ১৯ শতকের শেষ দিকে তৈরি হলেও এটি জেড পাথরের সর্বোচ্চ মানের কারুশিল্পের একটি নিখুঁত উদাহরণ।
ইউরোপে প্রথমবারের মতো প্রদর্শিত হওয়ায় এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, ন্যাশনাল প্যালেস মিউজিয়াম ও চীনা সংস্কৃতিতে এর বিশেষ অবস্থানের কারণে এই ছোট্ট বাঁধাকপিটি সত্যিই অনন্য।
সূত্র: সিএনএন