নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) বিভিন্ন জেলায় কর্মরত কর্মকর্তাদের তৈরি করা একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তাদেরই নারী সহকর্মীকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ, অশালীন ও যৌন হয়রানিমূলক আলোচনা করা হচ্ছিল। তাদের এসব কথোপকথন ফাঁস হওয়ার পর দাবি উঠেছে এসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের। ইতোমধ্যে ভুক্তভোগী নারী কর্মকর্তা কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য লিখিত আবেদন করেছেন বলেও জানা গেছে।
একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের নিরাপত্তার শঙ্কা থেকে চেয়ারম্যানের কাছে একটি ‘নারী হয়রানি প্রতিরোধ সেল’ গঠনেরও আবেদন করেছেন বলে জানা গেছে। তবে আজ পর্যন্ত এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের কোন খবর পাওয়া যায়নি।
বিষয়টি সামনে এসেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ফারিয়া আজাদের একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে। পোস্টটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকে এ ধরনের আচরণের নিন্দা জানিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। জানা গেছে, একটি ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ভুক্তভোগী নারীর শারীরিক গঠন, ব্যক্তিগত ও দাম্পত্য জীবন নিয়ে আপত্তিকর আলোচনা এবং যৌন হয়রানিমূলক রসিকতা করা হয়েছে।
ফারিয়া আজাদ বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে দীর্ঘদিন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন। পরে সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে বর্তমানে সুইডেনে টক্সিকোলজি বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিদেশে অবস্থানকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া তার বিভিন্ন ছবি ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা বিষয়কে কেন্দ্র করে সাবেক কর্মস্থলের কয়েকজন সহকর্মী আপত্তিকর আলোচনা করতেন। এ জন্য তারা ‘সংগ্রামী সৈনিকদের সঞ্চয়’ নামে একটি ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপও তৈরি করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই গ্রুপে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা যুক্ত আছেন। তারাই এ ধরনের মন্তব্য করেছেন। ওই কথোপকথনের কিছু স্ক্রিনশট কোনোভাবে ফারিয়া আজাদের হাতে পৌঁছার পর তিনি সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে নিজের ক্ষোভ ও বিস্ময়ের কথা জানান।
ফেসবুক পোস্টে ফারিয়া আজাদ বলেন, চার বছর আগে যে প্রতিষ্ঠান ছেড়ে এসেছেন, সেখানকার সাবেক সহকর্মীদের কেউ তাকে নিয়ে এ ধরনের মন্তব্য করতে পারেন-এটি তার কাছে অবিশ্বাস্য। একই সঙ্গে কর্মস্থলে নারী কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা ও সহকর্মীদের মানসিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তারা হলেন রাজশাহী জেলার নিরাপদ খাদ্য অফিসার চিন্ময় প্রামাণিক, সিলেট জেলার নিরাপদ খাদ্য অফিসার সৈয়দ সারফরাজ হোসেন, জামালপুর জেলার নিরাপদ খাদ্য অফিসার আবু নাসের মোহাম্মদ শফিউল্লাহ, রংপুরের নিরাপদ খাদ্য অফিসার মো. লোকমান হোসেন, মৌলভীবাজার জেলার নিরাপদ খাদ্য অফিসার মো. শাকিব হোসাইন, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ঔষধ তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ (কর্তৃপক্ষে আগে চাকরি করতেন) এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শাকিল আহম্মেদ (তিনিও আগে কর্তৃপক্ষে চাকরি করেছেন)।
এর মধ্যে চিন্ময় প্রামাণিক ও সরফরাজ হোসেন আগেও একবার আলোচনায় এসেছিলেন অন্যভাবে। তারা ব্যাড বয়েজ গ্রুপ নামে একটি গ্রুপে ছিলেন। যারা সেমিনারের নাম করে ঢাকা অফিসের এক কর্মকর্তাকে নিয়ে সরকারি টাকায় প্রমোদ ভ্রমণ করে বেড়িয়েছেন। তবে অভিযোগ উঠার পর কোন এক অদৃশ্য কারণে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি
বিএফএস এর চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলামের সঙ্গে ফোনে কথা বলার চেষ্টা করে পাওয়া যায়নি। তবে চেয়ারম্যান অন্য গনমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে জানিয়েছেন, এ বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছেন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। অভিযোগটি যথাযথভাবে তদন্ত করা হবে এবং তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কাছে ‘নারী হয়রানি প্রতিরোধ সেল’ গঠনের আবেদন জানিয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে কর্মক্ষেত্রে কোনো নারী কর্মকর্তা বা কর্মচারী হয়রানি, অশালীন আচরণ, অপব্যবহার বা বৈষম্যের শিকার হলে যেন সহজে অভিযোগ জানাতে ও প্রতিকার পেতে পারেন, সে জন্য এ ধরনের সেল গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার প্রেক্ষাপটে নারী কর্মীদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ারও অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন আচরণ সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর লঙ্ঘন। উক্ত বিধিমালার স্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী - সরকারি কর্মচারীদের এমন কোনো আচরণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, যা কোনো নারী কর্মচারীর শালীনতা বা মর্যাদাহানি ঘটায় কিংবা অসদাচরণের পর্যায়ে পড়ে। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী কোনো সহকর্মীর বিরুদ্ধে চরিত্রহনন, ডিজিটাল মাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ আলোচনা ও অশালীন মন্তব্য করা সুস্পষ্ট অসদাচরণ, যার চূড়ান্ত শাস্তি হিসেবে চাকরি থেকে অপসারণ বা বরখাস্তের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে।
হাইকোর্টের রিট পিটিশন ৫৯৩৯/২০০৮-এর নির্দেশনা মোতাবেক উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো নারীর শালীনতাহানি, শারীরিক বা মানসিক চাপ সৃষ্টি, ডিজিটাল মাধ্যমে উত্যক্ত করা বা তার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে অপ্রীতিকর মন্তব্য করা শাস্তিযোগ্য যৌন হয়রানি হিসেবে গণ্য।
জানা গেছে, তারা যে গ্রুপে কথা বলেছেন সে গ্রুপটা মূলত একটা সমিতি করছিল। সে সমিতির মাধ্যমে তারা নিজেদের জন্য জমি কিনেছে। রাজশাহী বিভাগে কেনা এই জমির রেজিষ্ট্রেশনও হয়েছে গত জুনের ২৪ তারিখ। তবে রেজিষ্ট্রেশন করার আগে কর্তৃপক্ষ থেকে কোনো অনুমতিও নেয়নি বলে জানা গেছে।