শিক্ষক নেই, দক্ষতাও নেই

মাধ্যমিক ও সমমানের ফলে এবার সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষায়। এ বছর দাখিলে পাসের হার নেমে হয়েছে ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশে, আর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশে। গত বছরের তুলনায় দাখিলে পাসের হার কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশ, কারিগরিতে কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। শুধু তাই নয়, ২০২২ সালে দাখিলে ৮২ দশমিক ২২ শতাংশ ও কারিগরিতে ৮৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ পাসের হার ছিল। চার বছরের ব্যবধানে সেটা মাদ্রাসায় ২৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ ও কারিগরিতে ৩১ দশমিক ৩৫ শতাংশ কমেছে।

ফলের এই পতনকে শুধু শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। এর জন্য মোটা দাগে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষক সংকট, শিক্ষকদের দক্ষতার ঘাটতি, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক দুর্বল তদারকি এবং শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি ও করোনার সময় অটো পাসকে দায়ী করছেন শিক্ষাবিদরা। এ ছাড়া দীর্ঘদিনের ব্যবহারিক শিক্ষার ঘাটতি এবং এই দুই শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি সরকারের উদার দৃষ্টিভঙ্গির অভাবে দিনে দিনে তলানিতে নামছে শিক্ষার মান।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, খারাপ ফলের পেছনে সমষ্টিগত ব্যর্থতা রয়েছে। দক্ষ শিক্ষক ও শিক্ষা উপকরণ যেমন সরকার দিতে পারছে না, তেমনি সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পরও শিক্ষকরা নিজেদের প্রমাণ করতে পারছেন না, আবার শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনার প্রতি উদাসীনতা বাড়ছে, অভিভাবকদেরও সচেতনার অভাব রয়েছে।

যদিও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান ও কারিগরি বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রুহুল আমিন এবারের ফলকে বিপর্যয় বলতে না নারাজ। তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবার যোগ্যতা অনুযায়ী ফল হয়েছে। কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও নকলের সুযোগ ছিল না, গ্রেস দেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা দিতে পারেনি, পরীক্ষকরা খাতার ওপর ভিত্তি করেই নম্বর দিয়েছেন। কোভিডের কারণে শিক্ষার্থীরা অটো পাস করেছিল, ফলে পড়াশোনায় ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, জুলাই আন্দোলনের সময় দীর্ঘদিন আন্দোলনে অংশ নেওয়া ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা এবং নবম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণিতে ওঠার পর কারিকুলাম পরিবর্তনের কারণে সামগ্রিক ফলে প্রভাব পড়েছে বলে মনে করেন তারা।

মাদ্রাসায় শিক্ষক নেই, মানসম্মত পাঠদানও নেই : মাদ্রাসা শিক্ষার বিষয়ে গত ২৩ এপ্রিল শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সংসদে জানান, দেশে তিনটি সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা এবং ৮ হাজার ২২৯টি এমপিওভুক্ত বেসরকারি মাদ্রাসা রয়েছে। মাদ্রাসায় সুপারিনটেনডেন্টের ১ হাজার ৩৫৪টি এবং সহকারী সুপারিনটেনডেন্টের ১ হাজার ৭৭৭টি পদ শূন্য রয়েছে। ফলে এসব মাদ্রাসা নানা সংকটে পড়ছে। প্রতিষ্ঠান প্রধান ছাড়া সঠিক লক্ষ্যে আগানো দুরূহ। এনটিআরসিএর তথ্য অনুযায়ী, মাদ্রাসা শিক্ষায় ৪১ হাজার ৯৬৫টি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ বিষয়গুলোর শিক্ষক সংকট বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলোতে পর্যাপ্ত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সাধারণ শিক্ষার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন।

সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ধারণ বাজার দাখিল মাদ্রাসায় ইবতেদায়ি থেকে দাখিল পর্যন্ত পড়ানো হয়। কিন্তু প্রথম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়ানোর জন্য এখানে গণিত ও ইংরেজি শিক্ষক রয়েছেন মাত্র একজন করে। এটা কেবল ধারণ বাজার মাদ্রাসার চিত্রই নয়, দেশের অধিকাংশ মাদ্রাসাতেই ইংরেজি ও গণিতের শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। ফলে এসব মাদ্রাসায় অন্য বিষয়ের শিক্ষকরা গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে পাঠদান করান। সরকারি এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষকদের অর্ধেকেরই বেশি সমাজবিজ্ঞান, ধর্ম, লাইব্রেরি বিজ্ঞান ও শারীরিক শিক্ষার। ইংরেজি ও গণিতের শিক্ষক রয়েছেন যথাক্রমে ২৪ হাজার ৭০২ জন ও ২৩ হাজার ৯৯৬ জন। ইংরেজিতে প্রতি ৪১০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন এবং গণিতে প্রতি ৪২২ শিক্ষার্থীর বিপরীতে মাত্র একজন শিক্ষক পাঠদান করেন।

শিক্ষক সংকট ছাড়াও যারা পড়াচ্ছেন তাদের বিষয়ভিত্তিক দক্ষতাও খতিয়ে দেখা জরুরি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, যখন ধর্মের শিক্ষক গণিত কিংবা ইংরেজি পড়ান তখন শিক্ষার্থীদের অবস্থা কী হবে তা চিন্তা করাও কঠিন। পাসের হার নয় শিক্ষার মান বাড়ানোতে মনোযোগী হতে হবে। এবার কোনো শিক্ষার্থীকে গ্রেস দিয়ে পাস করানো হয়নি, তাই পাসের হার কমেছে বলে জানান মাদ্রাসা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকৃত ফল প্রকাশ হওয়া দরকার, কৃত্রিমভাবে নম্বর বাড়িয়ে ৭০-৯০ শতাংশ পাস করালে প্রকৃত সমস্যা বোঝা যেত না। এবার প্রকৃত ফল সামনে আসায় সমস্যা শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শুধু মাদ্রাসায় নয় ইংরেজি, গণিতসহ বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষ শিক্ষক সংকট সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই রয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে বিষয়টি চিহ্নিত করে কাজ শুরু করেছে।

কারিগরিতে শিক্ষক নেই, ল্যাব নেই, দক্ষতাও নেই : শিক্ষামন্ত্রীর সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ১৫ হাজার ৮৪৪টি অনুমোদিত শিক্ষক পদের বিপরীতে বর্তমানে অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ৮ হাজার ৪৮৬টি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাধিক শিক্ষক জানান, কারিগরি শিক্ষার সবচেয়ে বড় সমস্যা শিক্ষক সংকট। অনেক সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভোকেশনাল শাখা চালু করা হলেও প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। আবার ভোকেশনাল শিক্ষা চালু থাকা প্রায় ২০০টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি হওয়ার পর সেগুলোর ভোকেশনাল শিক্ষকদের সাধারণ শিক্ষার শিক্ষক হিসেবে জাতীয়করণ করা হয়। এতে ভোকেশনাল শাখায় শিক্ষক সংকট আরও বেড়ে যায়। পরিকল্পনা ছাড়া বিপুলসংখ্যক বেসরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেওয়া হলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় শিক্ষক, ল্যাবরেটরি ও শিক্ষা উপকরণের ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে শিক্ষার মান যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি শিক্ষার্থীরাও আগ্রহ হারাচ্ছে।

এই শিক্ষকরা বলেন, বিদেশে কারিগরি শিক্ষাকে যেভাবে অভিভাবকরা গ্রহণ করেন আমাদের দেশে তার উল্টো চিত্র। এখানে মেধাবী শিক্ষার্থীরা সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করতে চায়। মেধায় যারা পিছিয়ে এবং বিভিন্নভাবে সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত তারাই কারিগরিতে পড়তে আসে। তা ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীই খুঁজে পাওয়া যায় না। কারিগরি শিক্ষা হাতে-কলমের হলেও শিক্ষার্থীরা ক্লাসেই আসতে চায় না।

বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ভোকেশনাল শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন পাওয়া দেশের ৩ হাজার ৪৪০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬২১টিতে কোনো শিক্ষা কার্যক্রমই নেই। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারিগরি শিক্ষা নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বের কথা বলা হলেও বাস্তবে মানোন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ কম। কারিগরি শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কারিগরি শিক্ষায় শুধু বই পড়িয়ে দক্ষ কর্মী তৈরি করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন আধুনিক ল্যাবরেটরি, যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষক এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাস্তব প্রশিক্ষণের সুযোগ। কিন্তু ল্যাব ও প্রয়োজনীয় উপকরণের সংকটের ফলে এবার ব্যবহারিকেও অনেক শিক্ষার্থী খারাপ ফল করেছে, যা সার্বিক ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।

কারিগরি বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রুহুল আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোভিডের পর থেকে শিক্ষার্থীরা ক্লাসেই যেতে চায় না। এবার এসএসসি পরীক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ করোনার সময় নিয়মিত পড়াশোনা করেনি। সে সময় অটো পাস দেওয়ার একটা সংস্কৃতি ছিল, যা পড়াশোনা ও নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার অভ্যাস নষ্ট করে দিয়েছে এই প্রভাব এবারের ফলাফলে স্পষ্ট। একটা প্রতিষ্ঠানে ১০০ শিক্ষার্থী থাকলে ক্লাসে ২০-৩০ জন থাকে। ক্লাসে না আসলে পাস করা যাবে না এবারের ফল দেখে শিক্ষার্থীরা তা বুঝতে পারবে।