খামারবাড়িতে সিন্ডিকেট কর্মকর্তারা তটস্থ

সচিবপুত্র পিতার প্রভাব খাটিয়ে গড়েছেন এক সিন্ডিকেট; রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে (ডিএই) তিনি গড়েছেন একচ্ছত্র আধিপত্যের রাজত্ব। ওই রাজত্বে এবার ভাটার টান পড়তে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে, কারণ গত ১১ আগস্ট কৃষি-সচিব রফিকুল ই মোহামেদের দপ্তর পরিবর্তিত হয়েছে। তাকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের জনবিভাগের সচিব করা হয়েছে।

ডিএই সূত্রে জানা গেছে, সচিবপুত্র মো. ফয়সাল অ্যগ্রিকালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (অ্যাব)-এর আহ্বায়ক কমিটির সদস্যসচিব শাহাদাত হোসেন বিপ্লবকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তুলেছেন ওই সিন্ডিকেট। তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সংস্থাটির বিভিন্ন দপ্তরে বদলি, পদায়ন ও প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের তদবির-বাণিজ্য। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মারপিট প্রভৃতি অপকর্মের অভিযোগও রয়েছে এ চক্রের বিরুদ্ধে। ফলে কৃষি খাত পরিচালনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাটির সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অস্থিরতা বিরাজ করছে।

জানা গেছে, চলতি বছরের জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বসুন্ধরা সিটিতে ওই সিন্ডিকেটের বিশেষ সভা হয়েছে। সভায় উপস্থিত ছিলেন শাহাদাত বিপ্লব, সচিবপুত্র ফয়সাল এবং ডিএইর আইসিটি বিভাগের উপপরিচালক কৃষিবিদ জাহাঙ্গীর আলম। সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল ডিএইর সবচেয়ে বড় প্রকল্প ‘পার্টনার’-এর প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর (পিসি) নিয়োগ। পিসি-প্রার্থী হিসেবে ছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। অভিযোগ, বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এ কর্মকর্তা পরিচালক হতে ওই বৈঠকে গিয়েছিলেন, শর্তে বনিবনা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তদবিরের প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত রূপ পায়নি। ওই ঘটনা ডিএইর অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। এর আগে সাবেক কৃষিসচিব অন্য এক কর্মকর্তাকে প্রকল্পটির পিসি বানাতে চাইলেও তা হয়নি।

জানা গেছে, একই অবস্থা তৈরি হয়েছে কৃষির যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পে। প্রকল্পটি দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল, অবশেষে চালুর অনুমোদন দিয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। এটির পরিচালক করার জন্য প্রকল্পের বর্তমান উপপরিচালক আবুল খায়ের মো. মাজহারুল ইসলামের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সচিবপুত্র ও বিপ্লব সিন্ডিকেট। বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তাকে প্রকল্প-পরিচালক করার জন্য মাঠে নেমেছে সিন্ডিকেটটি। নির্ধারিত অঙ্কের একটা অংশ আগাম প্রদান করা হয়েছে বলেও আলোচনা চলছে ডিএইতে।

ফয়সালের মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালক হওয়ার আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন কি না জানতে চাইলে মাজহারুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চেষ্টা করে যাচ্ছি, দেখা যাক কী হয়। আমার শুভাকাক্সক্ষীরাও চেষ্টা করছে।’ 

জানা গেছে, ফয়সাল ও বিপ্লব সিন্ডিকেট বিভিন্ন তদবির নিয়ে কৃষিসচিবের কাছে যেতেন। এ সিন্ডিকেটের তদবিরে বিদায়ী কৃষিসচিব রফিকুল ই মোহামেদ ডিএইর মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিমের একটি ফাইল উপস্থাপন করেন কৃষিমন্ত্রীর কাছে। তাকে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। মাসখানেকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সুপারিশে চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া যায়নি।

কৃষিমন্ত্রীর কাছে বেশ কয়েকজন প্রকল্প পরিচালককে বদলানোর জন্য অ্যাবের পক্ষ থেকে চিঠিও দিয়েছেন শাহাদাত বিপ্লব। তিনি নিয়মিত সুপারিশের তদারকি করছেন। একটি সূত্র বলেছে, শাহাদাত বিপ্লব বিভিন্ন স্থানে বলে বেড়াচ্ছেন ‘স্বৈরাচারী আমলের পিডিগুলো এখনো রয়ে গেছে। এদের সরানোর কথা কৃষিমন্ত্রী শুনছেন না।’

যেসব প্রকল্পে আর্থিক বরাদ্দ বেশি, দরপত্রের কাজ চলমান, সেসব প্রকল্পে বিপ্লবের নজর রয়েছে। সচিবপুত্রকে সঙ্গে নিয়ে ক্ষমতা দেখাচ্ছেন তিনি। ডিএইর মহাপরিচালক নিজেই বিপ্লবের বলয়ে ঢুকে গেছেন, অনেক সিদ্ধান্ত বিপ্লবের পরামর্শে গ্রহণ করেন। বদলি, পদায়নসহ টেন্ডার ও নিয়োগ বাণিজ্যের কাজ করছে চক্রটি।

কৃষি অধিপ্তরের সাম্প্রতিক একটি পদায়নের তালিকা ঘিরে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। গত ২৩ জুলাই কৃষি অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের স্বাক্ষরে এক অফিস আদেশে ৬ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। তাদের মধ্যে অন্তত দুজন কর্মকর্তা রয়েছেন যাদের দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় পদায়ন দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বিপ্লবচক্রের তদবিরে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক তাদের পছন্দের জায়গায় নতুন পদায়নের আদেশ জারি দিয়েছেন।

আব্দুর রহিমের তদবিরে ৩০ জুলাই কৃষি মন্ত্রণালয়ের জারি করা অন্য এক আদেশে খামারবাড়িতে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিসিএস (কৃষি) ক্যাডারের ১৮ ব্যাচের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিভাস চন্দ্র সাহা ও মো. সাইফুল আজম খানকে ডিঙ্গিয়ে ডিজির আপন ভায়রা মো. রওশন আলমকে পরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) হিসেবে পরিকল্পনা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আইসিটি উইংয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, সিন্ডিকেটের হয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করেন অ্যাবের সদস্য মো. আশরাফুল ইসলাম এবং কৃষিবিদ কে আই এফ সবুর। সচিব ও সচিবের ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন শাহাদাত বিপ্লব। এ ছাড়া ডিএইর ফ্লাড রিকনস্ট্রাকশন ইমার্জেন্সি অ্যাসিসটেন্স প্রজেক্ট (ফ্রিপ)-এ সংযুক্ত কৃষি প্রকৌশলী মো. বেলাল সিদ্দিকী সিন্ডিকেটে গুরু দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া বগুড়ার পরিচয়ে মো. রাকিব নামের এক ব্যক্তি সারাক্ষণ সচিবের দপ্তরে অবস্থান এবং বিভিন্ন স্থানে সচিবের সঙ্গেই যাতায়াত করতেন বলে আলোচনা রয়েছে। এ সিন্ডিকেটে আরও একজন রয়েছেন যিনি কৃষিমন্ত্রীর এলাকার এবং মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে বেড়ান, যার নাম মো. হাসান। এ সিন্ডিকেটের সবাই সচিবের সঙ্গে নিয়মিত চলাফেরা করতেন এবং সচিবের ছেলের সঙ্গে সখ্য রেখে চলত।

ডিএইর মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তদবির-বাণিজ্যের কোনো সুযোগই নেই, কারও প্রভাবেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। তবে বিতর্কিত ব্যক্তিরা যে যেখানে থাকার কথা সেখানেই দায়িত্ব পাচ্ছেন।’

নিজের ভায়রার পদায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা তো মন্ত্রণালয় থেকে হয়। আমার করার সুযোগ নেই। তাছাড়া এটা রুটিন দায়িত্ব, এটাতে সমস্যা দেখি না।’

মারপিটের আতঙ্কে ডিএই : চলতি বছরের মার্চের ১১ তারিখ ডিএইর মহাপরিচালকের কাছে একটি চিঠি দিয়েছেন ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক ড. মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ূম মজুমদার। বিষয় ছিল চাঁদা দাবি ও জীবননাশের হুমকি। চিঠিতে তিনি জানান, মার্চের ১১ তারিখ দুপুর দেড়টার দিকে শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ^বিদ্যালয় শাখা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক বি এম আলমগীর কবিরের নেতৃত্বে ১০-১২ জন অফিস রুমে এসে চাঁদা দাবি করেন। তারা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে।

একই দিনে তাদের হাতে হেনস্তার শিকার হয়েছেন পেঁয়াজ সংরক্ষণ প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. মাহফুজুর রহমান। তখন তিনি অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. হাবিব উল্লাহর রুমে ছিলেন। তিনি জানান, রুম থেকে ডেকে নিয়ে তার কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা না পেয়ে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়। তিনিও মহাপরিচালকের কাছে অভিযোগ করেন। কিন্তু তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও উদ্বেগ কমাতে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে পারেননি মহাপরিচালক। দুটি ঘটনাতেই বিপ্লবের ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) চত্বরে ডিএইর এক সিনিয়র কর্মকর্তাকে আরেক জুনিয়র কর্মকর্তা ঘুষি মারে। গত ৮ জুন রাতে এ ঘটনা ঘটে। এতে আহত হন ডিএইর অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ উইং) ও ২৯তম বিসিএস কৃষি ক্যাডারের কর্মকর্তা বনি আমিন খান। তাকে ঘুষি মারেন ডিএইর অতিরিক্ত উপপরিচালক এবং ৩১তম বিসিএস কৃষি ক্যাডারের কর্মকর্তা এ এম মাসুম বিল্লাহ। এ ঘটনায় মহাপরিচালক কোনো তদন্ত ছাড়াই দুজনকেই বদলি করে দেন। পরেও কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি। অভিযোগ রয়েছে, মাসুম বিল্লাহ মহাপরিচালকসহ একটি গ্রুপকে ম্যানেজ করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ঠেকিয়েছে।

এর আগে কেআইবির হিসাবরক্ষক জুলফিকার আলীকে ভয় দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটির এফডিআরের টাকা তুলে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। পরে কেআইবিতে ভাঙচুর চালায় অ্যাবের একটি অংশ। যার একটি অডিও কথোপকথন দেশ রূপান্তরের হাতে রয়েছে। এজন্য কেআইবির পক্ষ থেকে বিপ্লবসহ ৬০ জনের নামে একটি মামলাও করা হয়েছে তেজগাঁও থানায়।

গত ২ জুলাই ফেনীর অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) মো. সোফায়েল হোসেনকে ডিএইর প্রশাসন-১-এর অতিরিক্ত উপপরিচালক পদে পদায়ন করা হয়। তিনি যোগদানও করেন। হঠাৎ করেই ১২ জুলাই তার আদেশ বাতিল করে আবার ফেনীতেই পুরনো পদে পাঠানোর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আদেশটি বাতিল করে তাকে প্রশাসনে পুনর্বহাল করা হয়। বিষয়টি নিয়ে ডিএইর কর্মকর্তাদের মধ্যে মুখরোচক আলোচনা রয়েছে। তাদের ভাষ্য, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সুবিধা না দেওয়ায় অর্ডার বাতিল করা হয়। প্রতিশ্রুতি পূরণের সাপেক্ষে তাকে প্রশাসনে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হয়।

শাহাদাত বিপ্লব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা কেআইবিতে আছি, ডিএইতে আমাদের কোনো কাজ নেই। তাই প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নই ওঠে না।’ তবে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলের যেসব প্রকল্প-পরিচালক কাজ করছেন তাদের সরিয়ে ভালো, দক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিতে মন্ত্রণালয়ে অনেকদিন ধরেই বলছি। কিন্তু কৃষি মন্ত্রণালয় এসবে মনোযোগ দিচ্ছে না।’

কৃষিসচিবের ছেলে ফয়সালের সঙ্গে মিলেমিশে প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সচিবের ছেলের সঙ্গে আমার কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক নেই। তবে কৃষিসচিব (সাবেক) যেহেতু আমাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন সেজন্য তার সঙ্গে নিয়মিত চলাফেরা করি, একসঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করি।’