সংগীতে এআই আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ

প্রযুক্তির দ্রুত বিবর্তনে সংগীতে বিরাজ করছে অস্থিরতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্যে তৈরি হচ্ছে গানের সুর, সংগীতায়োজন, এমনকি অবিকল মানুষের মতো গায়কী! সবখানেই এখন এআইয়ের শক্তিশালী পদচারণা। কেউ একে দেখছেন মেধা ও সৃষ্টির ওপর যান্ত্রিক আগ্রাসন। আবার কারও মতে, এটি কেবলই এক আধুনিক সহায়ক মাধ্যম। সংগীতে এআইয়ের এই প্রভাব কি সত্যিই শিল্পীদের জন্য হুমকি, নাকি নতুন সম্ভাবনা; আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ? এ নিয়ে কথা হয় দেশের জনপ্রিয় সংগীত পরিচালক ও কণ্ঠশিল্পীদের সঙ্গে। তাদের ভাবনা তুলে ধরেছেন তারেক আনন্দ

নেতিবাচক ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানাই

রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা

প্রযুক্তি তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। মানুষের সহায়তার জন্যই প্রযুক্তির সৃষ্টি। প্রযুক্তি যদি মানুষের মেধা ও শিল্পচর্চাকে ছাপিয়ে যায়, তখন আর মানুষের কোনো প্রয়োজন থাকে না। বিশেষ করে বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে বর্তমানে এআইয়ের যে ব্যবহার শুরু হয়েছে তা নিয়ে আমি শঙ্কিত। এখন গান তৈরি করতে কাউকে আর গাইতে হচ্ছে না, লিখতে হচ্ছে না! শুধু একটি ধারণা দিলেই কণ্ঠসহ আস্ত একটি গান তৈরি হয়ে যাচ্ছে। এই বিষয়টি শিল্পীদের জন্য ভীষণ ভয়ের। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে হয়তো একসময় দেশে প্রকৃত শিল্পীদের কোনো প্রয়োজনই থাকবে না। প্রযুক্তির এই আগ্রাসনে সংগীতাঙ্গনে এক ভয়াবহ প্রভাব পড়বে। এআইয়ের তৈরি গানের দাপটে শিল্পীরা হয়তো সংগীতের মূল সাধনা থেকেই দূরে সরে যাবেন। অলসতার পাশাপাশি তাদের মধ্যে এমন ভীতিও কাজ করতে পারে যে, তারা হয়তো প্রযুক্তির চেয়ে ভালো কিছু আর সৃষ্টি করতে পারবেন না। গান তৈরিতে এআইয়ের এই যথেচ্ছ ব্যবহারের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করি আমি। এআইয়ের ব্যবহার শ্রোতাদের মাঝে চরম বিভ্রান্তিতে ফেলছে। কোনটি আসল আর কোনটি প্রযুক্তির তৈরি, তা বোঝা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংগীতবোদ্ধারা অনেক সময় ধরতে পারলেও সাধারণ শ্রোতারা এই পার্থক্য একেবারেই বুঝতে পারছেন না। তাই সংগীতে এআইয়ের এমন নেতিবাচক ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানাই।

প্রযুক্তির সাহায্য যত কম নেওয়া যায়, ততই ভালো

আরফিন রুমি

যার যতটুকু মেধা সে সেভাবেই কাজ করবে, এটাই নিয়ম। এআই আপনাকে সাউন্ড, টেকনিক্যাল কিছু বিষয়ে হয়তো সাহায্য করতে পারে, কিন্তু সৃজনশীলতার জায়গাটা নিজের। প্রযুক্তির সাহায্য যত কম নেওয়া যায় ততই ভালো। বিশেষ করে টিউন, ড্রামস, লুপের ক্ষেত্রে অন্যের ওপর নির্ভর না করে নিজে বাজাতে শেখাটা অনেক বড় প্রাপ্তি। প্রযুক্তি আপনাকে আইডিয়া দিতে পারে, কিন্তু নিজে শিখলে কাজটা আরও বেশি আনন্দের হয়।

এআই কখনো মানবিক অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারবে না

শওকত আলী ইমন

সংগীতের বিবর্তনে প্রযুক্তি কোনো নতুন বিষয় নয়। এক সময় মানুষ অ্যানালগ ব্যবস্থা থেকে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে এসেছে, প্রযুক্তির কল্যাণেই এসেছে ভার্চুয়াল ইনস্ট্রুমেন্ট আর তার ধারাবাহিকতায় আজকের দিনে এসে যুক্ত হয়েছে এআই। সংগীতে এআইয়ের এই আগমনকে একেবারেই হুমকি হিসেবে না দেখে, এটিকে একটি ‘পাওয়ারফুল টুল’ হিসেবেই দেখা যুক্তিসংগত।

সংগীত পরিচালনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, প্রযুক্তির যত উন্নতিই হোক না কেন এআই মূলত বিভিন্ন ডেটা বিশ্লেষণ করে একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন তৈরি করে দেয় মাত্র। অন্যদিকে একজন মানুষ গান সৃষ্টি করেন তার নিজস্ব অনুভূতি, জীবনবোধ, অভিজ্ঞতা ও আত্মিক তাগিদ থেকে। মানুষের গান আর রোবটের তৈরি সুরের মধ্যে মূল পার্থক্যটাই ফুটে ওঠে এই জায়গায়।

অবশ্য প্রযুক্তির এই জোয়ারের সঙ্গে সঙ্গে কিছু বড় ধরনের চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। এআই ব্যবহার করে খুব দ্রুত ও সহজে বিপুল পরিমাণ গান তৈরি সম্ভব হওয়ায়, ইন্ডাস্ট্রিতে নিজেদের স্বকীয়তা ও মৌলিকতা ধরে রাখা সত্যিকারের সৃজনশীল শিল্পীদের জন্য এখন কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ছে।

তবে প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক না কেন, মানুষ দিন শেষে মানুষের হৃদয়ের অনুভূতি ও অনুভূতির প্রকাশের সঙ্গেই যুক্ত হতে পছন্দ করে। তাই এআই সংগীত তৈরির মাধ্যমকে বদলাতে পারলেও, মানুষের সৃজনশীলতা কখনোই প্রতিস্থাপিত করতে পারবে না। কারণ দিন শেষে এটি মানতেই হবে, এআই মানুষেরই সৃষ্টি, এআই কখনো মানবিক অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারবে না।

বিশ্বজুড়েই মৌলিক কাজের আলাদা মূল্যায়ন আছে

বাপ্পা মজুমদার

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে নির্মিত গান খুব বেশি দিন টেকসই হবে না বলে মনে করেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও সুরকার বাপ্পা মজুমদার। তার মতে, এআই মূলত একটি কাজের সহায়ক উপকরণ মাত্র। একে একটি টুল হিসেবে ব্যবহার করা পর্যন্ত ঠিক থাকলেও, বর্তমানে এর ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে আস্ত গান বানিয়ে ফেলার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘস্থায়ী রূপ পাবে না। ভবিষ্যতে এমন এক সময় আসবে যখন এটি অরিজিনাল কাজের মানদ-ে পৌঁছাতে পারবে না এবং এআই নিজেই হয়তো অরিজিনাল নয়, এমন কাজকে শনাক্ত করে ব্লক করতে শুরু করবে।

তিনি উল্লেখ করেন, প্রযুক্তি ও এআই পলিসির দ্রুত পরিবর্তনের প্রভাবে অরিজিনাল সৃষ্টির আবেদন সবসময়ই থাকবে। প্রযুক্তিগত এই পরিবর্তনের ফলে শিল্পীদের মনে কাজ হারানোর এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক হলেও, এআই কখনোই মৌলিক সৃষ্টিশীলতার স্থায়ী বিকল্প হতে পারবে না। বিশ্বজুড়েই মৌলিক কাজের আলাদা মূল্যায়ন আছে বলে তিনি মনে করেন।

এআই কেবল একজন দক্ষ অ্যাসিস্ট্যান্টের ভূমিকা পালন করতে পারে

হাবিব ওয়াহিদ

সংগীতশিল্পী হাবিব ওয়াহিদ মনে করেন, ভবিষ্যতের কথা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও সময়ের বিবর্তনে মানুষ প্রযুক্তিকে গ্রহণ করে নেওয়াই স্বাভাবিক। প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রায় এআইয়ের ক্ষেত্রেও হয়তো একই রূপ দেখা যাবে। তবে মানুষের সহজাত অনুভূতি থেকে তৈরি সুর কিংবা সংগীতের ক্ষেত্রে এআই কেবল একজন দক্ষ অ্যাসিস্ট্যান্টের ভূমিকা পালন করতে পারেÑ এমনটাই বিশ্বাস এই সংগীতশিল্পীর।

তার মতে, সংগীত সৃষ্টিতে পুরোপুরি এআই-নির্ভরতা সেরা ফলাফল নাও এনে দিতে পারে। আর কৃত্রিমভাবে তৈরি মানুষের অবিকল কণ্ঠের গায়কি শ্রোতারা কতটুকু গ্রহণ করবেন, তা সম্পূর্ণ তাদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত। শ্রোতারা যদি এআইয়ের তৈরি আর্টিফিশিয়াল ভয়েস জেনেও তা উপভোগ করেন, তবে সেটি তাদের ব্যক্তিগত রুচি ও পছন্দের বিষয়।

তবে এই প্রযুক্তির ইতিবাচক ও সুবিধাজনক দিকের কথাও তুলে ধরেন হাবিব। তিনি জানান, বিদ্যমান কোনো শিল্পীর কণ্ঠ যদি এআইয়ের মাধ্যমে পুনরায় তৈরি করা হয়, তা কিছু ক্ষেত্রে দারুণ সুবিধা এনে দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ কোনো দুর্ঘটনাজনিত কারণে কোনো শিল্পীর কণ্ঠ নষ্ট হয়ে গেলে কিংবা কোনো প্রিয় শিল্পী মৃত্যুবরণ করলে, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘ট্রিবিউট হিসেবে তার কণ্ঠের নতুন গান সামনে আনা সম্ভব। অস্কারজয়ী সংগীতপরিচালক এ আর রহমান সম্প্রতি একটি তামিল সিনেমায় প্রয়াত দুই শিল্পীর এআই-জেনারেটেড কণ্ঠ ব্যবহার করে নতুন গান তৈরি করেছিলেন, যা দর্শক-শ্রোতামহলে বেশ প্রশংসিত হয়েছিল।

মানুষের সৃজনশীলতারই জয় হবে

ফাহমিদা নবী

অতীতের কথা মনে করলে দেখা যায়, যখন অ্যানিমেশন প্রথম আসে, সিনেমা ও অন্যান্য মাধ্যমে এর ব্যবহার শুরু হয়। তখন অনেকেই এটাকে আকর্ষণীয় মনে করলেও একটি বড় অংশের কাছে বিষয়টিকে বেশ অস্বস্তিকর মনে হয়েছিল। আর বর্তমান সময়ে এআই এসে যেন পুরো বিশ^কে নতুন করে তছনছ করে দিচ্ছে। বিশেষ করে সংগীতে প্রযুক্তির এই দাপটকে হুমকি না বললেও, এটাকে মানুষ এবং রোবটের মধ্যকার এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বলা চলে।

রোবটের নিজস্ব কোনো হৃদয়, মানসিকতা কিংবা সৃজনশীলতা নেই, তারা স্রেফ গাণিতিক হিসাব-নিকাশে কাজ করে। অন্যদিকে মানুষ তার মেধা ও অনুভূতির প্রয়োগ ঘটায়। কাজের গতির দিক থেকে ভাবলে এটি খরগোশ আর কচ্ছপের দৌড় প্রতিযোগিতার মতো। মানুষ এখানে কচ্ছপ আর এআই হলো খরগোশ। তাই গতি ও পরিমাণের বিচারে এই যুদ্ধে হার-জিত নিয়ে ভাবার সুযোগ কম হলেও শেষ পর্যন্ত মানুষের মেধা ও সুন্দরেরই জয় হবে।

তবে এই রূপান্তরের মধ্যবর্তী সময়ে এআই যেন মানুষের মূল আনন্দটাকেই কেড়ে নিচ্ছে। মানুষ লেখার আনন্দ, সুর করার আনন্দ হারিয়ে ফেলছে। এখন যে গাইতে পারে না সেও গান বানিয়ে ফেলছে, নাটকের চিত্রনাট্য তৈরি থেকে শুরু করে সিনেমাতেও এআইয়ের যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে। মৌলিক চিন্তাভাবনা করতে মানুষ ক্লান্ত বোধ করছে আর সবকিছুর জন্য সহজে নির্ভর করছে প্রযুক্তির ওপর। কিন্তু এভাবে সবকিছু অতিমাত্রায় সহজ হতে হতে মানুষ একসময় পরনির্ভরশীল হয়ে পড়বে এবং নিজের চিন্তাশক্তিকেই পঙ্গু করে ফেলবে।

বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের তরুণরা এ প্রযুক্তির ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য সত্যিই ভয়ের বিষয়। তবে ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ না করে সঠিক ও সুন্দরের পক্ষে লড়াইটা মানুষকে চালিয়ে যেতে হবে। কারণ, এই এআই শেষ পর্যন্ত মানুষেরই সৃষ্টি। রোবটের মধ্যে কোনো ভালোবাসার অনুভূতি থাকে না, তাই তারা কখনোই হৃদয়ের গভীর থেকে ভালোবাসার কথা ফুটিয়ে তুলতে পারবে না।

বর্তমানে যারা এআই দিয়ে গান তৈরি করছে, তাদের সৃষ্টিকর্মে মেধার অভাবটা স্পষ্ট বোঝা যায়। আর যাদের প্রকৃত মেধা রয়েছে, তারাও যদি এআইয়ের ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করে কাজ সংক্ষিপ্ত করতে চায়, তবে তারা ভুল করবে। সংগীতের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস না করে নিজের জায়গায় অটল থাকা জরুরি। রোবটিক কৃত্রিমতায় বিশ্বাস না রেখে সততা ও মানুষের নিজস্ব মেধার ওপর আস্থা রেখে কাজ করে গেলে, দিন শেষে খরগোশ ও কচ্ছপের এই খেলায় মানুষের সৃজনশীলতারই জয় হবে।