সিনেমার ফেরিওয়ালাহীন দেড় দশক

তারেক মাসুদ স্মরণে বিশেষ আয়োজন

দেশের চলচ্চিত্রের ‘ফেরিওয়ালা’ বলে উপাধি পাওয়া নন্দিত চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদকে হারানোর ১৫ বছর পূর্ণ হলো আজ। স্বাধীন বাংলা চলচ্চিত্রের অনন্য এই রূপকার বরাবরই প্রথাগত ছকের বাইরে গিয়ে সিনেমার ক্যানভাসে তুলে ধরেছিলেন নিজের মাটি ও মানুষের জীবনগাথা। 

২০১১ সালের এই দিনে (১৩ আগস্ট) মানিকগঞ্জে চলচ্চিত্র ‘কাগজের ফুল’-এর দৃশ্যধারণের স্থান দেখে ঢাকা ফেরার পথে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় অকালে নিভে যায় এই মেধা। একই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীরসহ আরও তিনজন। চিরতরে থেমে যায় দুটি সৃজনশীল প্রাণ, তবে রেখে যান অগাধ সৃষ্টি আর নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের জন্য এক অলঙ্ঘনীয় প্রেরণা। 

এই দুই কালজয়ী ব্যক্তিত্বকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে প্রতি বছরের মতো এবারও বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ (ডিইউএফএস)। ‘স্মৃতিতে ও চলচ্চিত্রে: তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর’ শীর্ষক বিশেষ এই স্মারকমূলক আয়োজনে তুলে ধরা হবে তাদের জীবনদর্শন ও অমর সৃষ্টির কথামালা। আয়োজকরা জানান, সন্ধ্যা শুরু হবে এই স্মরণানুষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ও শামসুন্নাহার হল সংলগ্ন 'সড়ক দুর্ঘটনা স্মৃতিস্থাপনা' প্রাঙ্গণে প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সূচনা হবে শ্রদ্ধার্ঘ্যের। নিহত তারকাদের প্রতি সম্মান জানানোর এই আয়োজন চলবে সন্ধ্যা ৬টা থেকে। 

প্রদীপ প্রজ্বলন শেষে আয়োজন স্থানান্তরিত হবে সেলুলয়েডের পর্দায়। রাত ৭টায় টিএসসি মিলনায়তনে প্রদর্শিত হবে প্রসূন রহমান পরিচালিত তারেক মাসুদের জীবনীভিত্তিক বিশেষ তথ্যচিত্র ‘ফেরা’ (২০১২)। সিনেমাটির মধ্য দিয়ে দর্শক নতুন করে ফিরে পাবেন এই কালজয়ী নির্মাতার জীবনের নানা বাঁক ও শৈল্পিক সংগ্রামকে। এরপর রাত ৭টা ৪৫ মিনিটে প্রদর্শিত হবে তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ পরিচালিত বিখ্যাত প্রামাণ্যচিত্র ‘মুক্তির কথা’ (১৯৯৯)। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতা ও চেতনার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এই প্রামাণ্যচিত্রটি সর্বকালের অন্যতম সেরা সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত। 

ঢাবি চলচ্চিত্র সংসদ থেকে জানানো হয়েছে, সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্রপ্রেমী সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য এই স্মৃতিপটে শ্রদ্ধাঞ্জলি ও প্রদর্শনীটি পুরোপুরি উন্মুক্ত থাকবে। চলচ্চিত্রকে যারা জীবনের অংশ মেনে পথ চলেন, তাদের জন্য এই সন্ধ্যাটি হতে যাচ্ছে এক স্মৃতিতুর ভালোবাসার মিলনমেলা। 

শিল্পী এস এম সুলতানের জীবনের ওপর নির্মিত ‘আদম সুরত’ (১৯৮৯) প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে চলচ্চিত্রকার হিসেবে তারেক মাসুদের আত্মপ্রকাশ। এরপর ১৯৯৬ সালে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবচিত্র নির্ভর প্রামাণ্যচিত্র ‘মুক্তির গান’ নির্মাণ করে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। ২০০২ সালে তার প্রথম ফিচার চলচ্চিত্র ‘মাটির ময়না’ মুক্তি পায়, যা কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট’সহ একাধিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দেয়। এটিই প্রথম কোনো বাংলাদেশি বাংলা চলচ্চিত্র, যা সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে একাডেমি পুরস্কারের (অস্কার) জন্য নিবেদন করা হয়েছিল।