যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চায় ইরান

উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের ব্যাপারে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা এখন সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে। দুই দেশ নীতিগতভাবে ৬০ দিনের চলমান যুদ্ধবিরতি বাড়াতে সম্মত হওয়ার কথা জানিয়ে ছিল মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গত জুনে সম্মত হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তিটি পুনরুজ্জীবিত করা এবং তা কার্যকর করার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের আলোচনায় কোনো ধরনের অগ্রগতি হয়নি। পাশাপাশি চলমান এই যুদ্ধের ভবিষৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রচারমাধ্যম পিবিএস’ কে এক বিরল সাক্ষাৎকার দিয়েছেন দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) জেনারেল মোহাম্মদ রেজা নাকদি। এ ইরানি জেনারেল বলেন, চলমান যুদ্ধ ইরান আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে। এই যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, আমাদের অভিজ্ঞতাও তত বাড়বে। এদিকে, ইরানের সেনাবাহিনীর নির্বাহী উপপ্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী রেজা শেখ জানিয়েছেন, তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন সক্ষমতার ৭৫ শতাংশের বেশি এখনো অক্ষত রয়েছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী নাকদি বলেন ‘যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কীভাবে লড়াই করতে হয়, সেই বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য এর আগে আমরা কখনো এমন আসল যুদ্ধ দেখিনি। তবে গত পাঁচ মাসে আমরা সেই কৌশল খুব ভালোভাবেই শিখে নিয়েছি।’ রেজা নাকদির মতে, এমন পদক্ষেপের মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে এ বার্তাই দেওয়া হচ্ছে যে ইরানের ওপর হামলা চালানোর একটি ‘কড়া মাশুল’ রয়েছে। শীর্ষ এই ইরানি জেনারেল বলেন, ‘আমাদের এমন এক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেন (ভবিষ্যতে) শত্রু কখনো আমাদের ওপর হামলা চালানোর সাহস না পায় এবং আমরা পুরোপুরি নিরাপদে বসবাস করতে পারি। এর অন্যতম উপায় হলো যুক্তরাষ্ট্রের আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত এ যুদ্ধকে টেনে নিয়ে যাওয়া এবং শত্রুকে দুর্বল করে ফেলা। ফলে পরে অন্য কেউ যদি ইরানের ওপর হামলার কথা ভাবে, তবে তারা ভালো করেই জানবে যে এর জন্য কত বড় মাশুল গুনতে হবে।

যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করতে পারে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আইআরজিসির জেনারেল হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এটি শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য একটি ‘মস্ত বড় ভুল’ হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। নাকদি বলেন, ‘তারা পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করার ঠিক পরদিন সকালেই বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের যত সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, তার সব কটি দখল করে নেওয়া হবে। আজকের পরিস্থিতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো নয়। বর্তমান বিশ্বের মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন। পৃথিবীর কোনো মানুষই এমন জঘন্য অপরাধ মেনে নেবে না। কারণ, তারা জানে, পরবর্তী সময়ে এ একই ঘটনার শিকার তারাও হতে পারে।’ ইরান পরমাণু বোমা তৈরির সম্ভাবনার প্রশ্নে তিনি জানান, এর কোনো ‘প্রয়োজনই নেই’। নিজ দেশের শক্তির উৎস ব্যাখ্যা করে খামেনির এই সহযোগী বলেন, ‘আমাদের আসল পারমাণবিক বোমা হলো, বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়; যা আমরা জুলুমের বিরুদ্ধে লড়াই করে জয় করেছি। কোনো ধরনের গণহত্যার প্রয়োজন আমাদের নেই।’ ইরানিদের ‘যুক্তরাষ্ট্র নিপাত যাক’ (ডেথ টু আমেরিকা) সেøাগানটির তীব্র সমালোচনা করেন ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনীতিকরা। এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ইরানি জেনারেল জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের সঙ্গে তাদের ‘কোনো শত্রুতা নেই’।

তেহরানের সক্ষমতা অক্ষত : ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সত্ত্বেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার ৭৫ শতাংশের বেশি অক্ষত এবং এখনো ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির একজন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা। গত বুধবার ইরানের সেনাবাহিনীর নির্বাহী উপপ্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী রেজা শেখ বলেন, ওয়াশিংটন যেমন দাবি করছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা ততটা সফল হয়নি। ইরানের ড্রোন ব্যবস্থাকে তিনি ‘শত্রুর জন্য দুঃস্বপ্ন’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার এই বক্তব্য ইরানের সামরিক সক্ষমতার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মূল্যায়নের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যদিও ট্রাম্প অতীতেও অনেক ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন; এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নও অনেকক্ষেত্রে ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘষির্ক হয়ে উঠেছিল। গত মাসে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, দীর্ঘ এই যুদ্ধের পর ইরানের আগের ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের মাত্র ২১ থেকে ২২ শতাংশ অবশিষ্ট রয়েছে।