যুদ্ধ চললে বিশ্বে তেল থাকবে কতদিন?

মার্কিন-ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া এবং সহসাই এটি সমাপ্তির কোনো আলামত না থাকায় তেল ব্যবসায়ী ও নীতি-নির্ধারকেরা একটি জরুরি প্রশ্নের মুখে পড়েছেন—ইতিহাসের বৃহত্তম সরবরাহ ঘাটতি সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল কি বিশ্বের কাছে মজুত রয়েছে?

এই প্রশ্নের উত্তর একেবারেই অস্পষ্ট। কারণ এটি কেবল কী পরিমাণ তেল মজুত রয়েছে তার ওপর নির্ভর করছে না, বরং এর মধ্যে কতটা তেল প্রকৃতপক্ষে বাজারে ছাড়া সম্ভব—তার ওপরও নির্ভর করছে।

বর্তমান মজুত দিয়ে যুদ্ধ কত দিন সামাল দেওয়া সম্ভব, তা জানতে হলে প্রথমেই দেখতে হবে সংকটের মাত্রা কতটা গভীর। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, সৌদি আরামকোর প্রধানের মতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্ব প্রায় ২৬০ কোটি (২.৬ বিলিয়ন) ব্যারেল তেল হারিয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর অর্জিত সরবরাহ ঘাটতির দিক থেকে এটিই এ যাবৎকালের সর্ববৃহৎ সংকট।

যুদ্ধপূর্ব সময়ে বিশ্বে দৈনিক তেলের চাহিদা ছিল ১০ কোটি ৩০ লাখ (১০৩ মিলিয়ন) ব্যারেল। সেই হিসাবে এই হারানো তেলের পরিমাণ বিশ্বের পুরো ২৫ দিনের ব্যবহারের সমান। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চীন তাদের চাহিদা কমানোয় বর্তমানে বৈশ্বিক তেলের ব্যবহার কিছুটা কমেছে।

যদিও আরামকো জানিয়েছে যে, পারস্য উপসাগর থেকে দৈনিক ১ কোটি ১০ লাখ (১১ মিলিয়ন) ব্যারেল তেলের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে, তবুও অধিকাংশ বিশ্লেষকের মতে, চাহিদা মেটাতে দৈনিক ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৫০ লাখ (৫ মিলিয়ন) ব্যারেল। গত জুলাইয়ে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় কাজাখস্তানের 'সিপিসি প্যাললাইন' বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হয়েছে, যা দিয়ে দৈনিক ১৮ লাখ (১.৮ মিলিয়ন) ব্যারেল তেল সরবরাহ করা হতো।

পশ্চিমা বিশ্বের জ্বালানি তদারকি সংস্থা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) গত মার্চে তাদের জরুরি মজুত থেকে ৪০ কোটি (৪০০ মিলিয়ন) ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার কথা ঘোষণা করে। তারা জানিয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে এখনো পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। ১৯৭৩-৭৪ সালের আরব তেল অবরোধের জবাবে গঠিত আইইএ-এর এই মজুতে সরকারি ও বাণিজ্যিক—উভয় ধরনের তহবিলই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বর্তমানে তাদের এই সম্মিলিত মজুতের পরিমাণ ১৫০ কোটি (১.৫ বিলিয়ন) ব্যারেল, যা ৫০ লাখ ব্যারেলের বর্তমান দৈনিক ঘাটতি অনুযায়ী পরবর্তী ৩০০ দিন সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

তবে সংস্থাটি তাদের বাণিজ্যিক মজুত বাজারে ছাড়ার আদেশ দিতে পারে না, কারণ শোধনাগারগুলো তাদের নিজস্ব পরিচালনা কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য এগুলো আটকে রাখে। ফলে বাস্তবে বিশ্ববাজারে ব্যবহারের উপযোগী হিসেবে থাকে কেবল সরকারিভাবে সংরক্ষিত ৯০ কোটি ব্যারেল তেল, যা বর্তমান দৈনিক ঘাটতির সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ১৮০ দিন পর্যন্ত চলতে পারে।

আইইএ তাদের মজুতের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস প্রকাশ করে না। তবে তাদের অবশিষ্ট সরকারি মজুতের এক-তৃতীয়াংশই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে।

যুক্তরাষ্ট্রের গভর্নমেন্ট অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিস (জিএও) গত মে মাসে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, তাদের ‘কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর)-এর ভৌত অবকাঠামোর দ্রুত অবনতি ঘটছে এবং এর ফলে তেলের মোট মজুতের চারভাগের একভাগ ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। 

র‍্যাপিডান এনার্জির বিশ্লেষকদের মতে, এর অর্থ হলো অন্তত ১০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে সরবরাহ করা আর কখনোই সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যদি ব্যবহারযোগ্য মাত্র ২০ কোটি ব্যারেল এসপিআর তেল অবশিষ্ট থাকে, তবে তা বর্তমান ঘাটতির বিপরীতে বড়জোর ৪০ দিনের মতো কাজ দেবে।

এনার্জি অ্যাসপেক্টস-এর বিশেষজ্ঞ ক্রিশ্চিয়ান এ গেল্যান্ডের মতে, অনেক দেশের হাতেই এখন সীমিত তেল অবশিষ্ট রয়েছে, ফলে আইইএ-এর পক্ষে নতুন করে বাজার তেলের যোগান দেওয়া বেশ কঠিন। অন্যদিকে ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের হামাদ হোসেন উল্লেখ করেছেন, বিশ্বজুড়ে মজুত কমে যাওয়ায় আকস্মিক ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা কমে গেছে, যা তেলের বাজারকে মারাত্মক মূল্যায়ন ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।

মরগান স্ট্যানলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে ডিজেল ও বিমানের জ্বালানির (জেট ফুয়েল) মজুত বিগত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। ডিবিএস ব্যাংকের সুর্ব সরকার জানান, মধ্যপ্রাচ্য এবং রাশিয়ার শোধনাগারগুলোতে চলমান যুদ্ধের ফলে ডিজেল ও বিমানের জ্বালানি সরবরাহ সবচেয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আইইএ-এর হিসাব মতে, বাণিজ্যিক মজুত, যুক্তরাষ্ট্রের এসপিআর, চীনের মজুত এবং সাগরে পরিবাহিত তেলসহ বৈশ্বিক মোট মজুতের চিত্র আপাতত মোটামুটি ভালোই দেখাচ্ছে। তবে এর বড় একটি অংশ বাস্তবে সংকট মোচনে সাহায্য করতে পারবে না। কারণ উদাহরণস্বরূপ—সাগরে পরিবাহিত তেলের একটা বড় অংশই ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে এবং তা গন্তব্যের পথে রয়েছে।

চীন কখনোই তাদের সংরক্ষিত তেলের আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করে না। তবে এনার্জি অ্যাসপেক্টস-এর অনুমান অনুযায়ী, গত জুলাই মাস পর্যন্ত চীনের কাছে প্রায় ১৭০ কোটি (১.৭ বিলিয়ন) ব্যারেল অপরিশোধিত তেল মজুত ছিল (যদিও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাবে এই পরিমাণ ১০০ থেকে ১৭০ কোটি ব্যারেলের মধ্যে ওঠানামা করে)। এছাড়া তাদের কাছে অজ্ঞাত পরিমাণ প্রক্রিয়াজাত জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যাল মজুত রয়েছে।

চীন যদি সত্যিই ১৭০ কোটি ব্যারেল তেল ধরে রাখে, তবে তারা হরমুজ প্রণালী দিয়ে যুদ্ধপূর্ব আমদানির (দৈনিক প্রায় ৫৫ লাখ ব্যারেল) অভাব প্রায় এক বছর পর্যন্ত মেটাতে পারবে। জাপানের পাশাপাশি বৈশ্বিক প্রধান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে চীন এখন সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক অবস্থানে রয়েছে।

সূত্র: আলজাজিরা