পৃথিবীর জলবায়ু দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বাড়ছে গড় তাপমাত্রা, দীর্ঘ হচ্ছে তাপপ্রবাহ, গলছে মেরু অঞ্চলের বরফ এবং বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। একই সঙ্গে কোথাও অতিবৃষ্টি ও ভয়াবহ বন্যা, কোথাও দীর্ঘ খরা, আবার কোথাও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় মানুষের জীবন ও অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের পেছনে একাধিক কারণ থাকলেও এর প্রধান চালিকাশক্তি মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। আর এই উষ্ণায়ন বাড়ানোর অন্যতম প্রধান কারণ হলো কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহার।
কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস আধুনিক সভ্যতার শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে। কিন্তু এসব জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে জমা হচ্ছে। এসব গ্যাস পৃথিবী থেকে মহাকাশে বেরিয়ে যাওয়ার কথা থাকা তাপের একটি অংশ আটকে রাখছে। ফলে বাড়ছে বৈশ্বিক তাপমাত্রা এবং বদলে যাচ্ছে জলবায়ুর স্বাভাবিক আচরণ।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, শিল্পবিপ্লবের পর থেকে কয়লা, তেল ও গ্যাস বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান জ্বালানি হয়ে ওঠে। কলকারখানা চালানো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, গাড়ি ও ট্রাক চালানো, বিমান উড্ডয়ন, জাহাজ চলাচল প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়তে থাকে। জীবাশ্ম জ্বালানির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলোতে কোটি কোটি বছর ধরে ভূগর্ভে সঞ্চিত কার্বন রয়েছে। কয়লা, তেল বা গ্যাস পোড়ানোর সময় সেই কার্বনের বড় অংশ অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি করে এবং তা বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে।
বায়ুমণ্ডলে স্বাভাবিকভাবেই কার্বন ডাই-অক্সাইড রয়েছে এবং এটি পৃথিবীর তাপমাত্রা বাসযোগ্য রাখার প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার অংশ। কিন্তু মানুষের কর্মকাণ্ডে এর ঘনত্ব দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে। এখানেই জীবাশ্ম জ্বালানির সবচেয়ে বড় জলবায়ুগত ঝুঁকি।
বিদ্যুতের চাহিদা প্রতিদিন: বিশ্বজুড়ে বিদ্যুতের চাহিদা প্রতিদিন বাড়ছে। শিল্পায়ন, নগরায়ণ, তথ্যপ্রযুক্তি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোর বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের প্রয়োজনও বাড়ছে। এই বাড়তি চাহিদা মেটাতে অনেক দেশ এখনো কয়লা, গ্যাস ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের অন্যতম বড় উৎস। কয়লা পুড়িয়ে পানি থেকে বাষ্প তৈরি করা হয় এবং সেই বাষ্পের মাধ্যমে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। কিন্তু একই প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে চলে যায়।
গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি: প্রাকৃতিক গ্যাসকে অনেক সময় কয়লার তুলনায় কম কার্বন-নির্গমনকারী জ্বালানি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে গ্যাসও জীবাশ্ম জ্বালানি। এটি পোড়ালে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। পাশাপাশি গ্যাস উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহনের সময় মিথেনসহ অন্যান্য গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। কয়লা পৃথিবীর সবচেয়ে কার্বন-নিবিড় জ্বালানিগুলোর একটি। একই পরিমাণ শক্তি উৎপাদনে গ্যাসের তুলনায় কয়লা পোড়ালে সাধারণত বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। এ কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। বিশ্বের বহু দেশে এখনো কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বিশেষ করে দ্রুত শিল্পায়ন ও বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে এমন দেশগুলোতে কয়লার ব্যবহার নিয়ে জলবায়ু উদ্বেগও বাড়ছে।
তেলজাত জ্বালানি পোড়াচ্ছে বেশি: জীবাশ্ম জ্বালানির আরেকটি বড় ব্যবহারকারী পরিবহন খাত। ব্যক্তিগত গাড়ি, বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, জাহাজ ও বিমানসহ সব মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে বিপুল পরিমাণ তেলজাত জ্বালানি পোড়ানো হচ্ছে। পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়ির ইঞ্জিনে জ্বালানি পোড়ানোর সময় কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি হয়। একটি যান যত বেশি জ্বালানি ব্যবহার করে, তার কার্বন নির্গমনও তত বেশি হয়। একইভাবে ভারী ট্রাক, পণ্যবাহী জাহাজ ও বিমান দীর্ঘ দূরত্বে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহার করে। ফলে বৈশ্বিক কার্বন নির্গমনের ক্ষেত্রে পরিবহন খাতও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
শিল্পায়নের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে কার্বন নিঃসরণ: শিল্পখাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার জলবায়ুর ওপর দুইভাবে প্রভাব ফেলে। প্রথমত, কারখানার বয়লার, চুল্লি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানো হয়। দ্বিতীয়ত, কিছু শিল্পের উৎপাদন প্রক্রিয়ার নিজস্ব রাসায়নিক বিক্রিয়াতেও কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি হয়। সিমেন্ট শিল্প এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সিমেন্ট তৈরির প্রধান কাঁচামাল চুনাপাথরকে উচ্চ তাপমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত করতে বিপুল শক্তির প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে চুনাপাথর থেকে ক্লিংকার তৈরির রাসায়নিক প্রক্রিয়াতেও কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। স্টিল উৎপাদনেও উচ্চ তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। ঐতিহ্যগতভাবে কয়লা ব্যবহার করে লোহা আকরিক থেকে লোহা উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ ঘটে। ফলে শিল্পায়নের সঙ্গে জলবায়ু সংকটের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। অর্থাৎ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার শুধু ধোঁয়া ছড়ানো গাড়ি বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি শিল্প উৎপাদন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং মানুষের দৈনন্দিন ভোগের বিস্তৃত ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।
বিকল্প হতে পারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি: জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। বাংলাদেশের জন্য সৌরবিদ্যুৎ বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়ায় সৌরবিদ্যুতের বিস্তারের সুযোগ রয়েছে। তবে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর শুধু সৌর প্যানেল স্থাপনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ গ্রিড আধুনিকীকরণ, শক্তি সঞ্চয় প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের বিষয়ও জড়িত।
বিশ্লেষকরা যা বলছেন: জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য শুধু জীবাশ্ম জ্বালানিই দায়ী নয়। কৃষি, বন উজাড়, শিল্পের বিভিন্ন প্রক্রিয়া ও অন্যান্য মানবিক কর্মকাণ্ডও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে ভূমিকা রাখে। তবে আধুনিক বিশ্বের বিপুল জ্বালানি চাহিদা মেটাতে কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানো মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের সবচেয়ে বড় উৎসগুলোর একটি। তাই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার কেন্দ্রীয় আলোচনায় বারবার ফিরে আসে জ্বালানি ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রশ্ন।
শুধু কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিলেই হবে না; বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে গাড়ি, শিল্প ও ভবনসব ক্ষেত্রেই জ্বালানি ব্যবহারের ধরন বদলাতে হবে। তারা আরও বলেছেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিচ্ছন্ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর যত দ্রুত সম্ভব করা যায়, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনাও তত বাড়বে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার লড়াই শেষ পর্যন্ত শুধু পরিবেশ রক্ষার লড়াই নয় এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং মানুষের নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করার লড়াই।