প্রধানমন্ত্রীর সফর

পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের দুই পাড়ের ৫০ লাখ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের আশা

জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে আজ রবিবার (১৬ আগস্ট) পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে আনুষ্ঠানিকভাবে মৎস্য পোনা অবমুক্ত করতে কিশোরগঞ্জ এসেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার এই সফরকে ঘিরে নদী তীরবর্তী দুই পাড়ের ৫০ লাখ মানুষের একটা আশা নদটি প্রাণ ফিরে পাবে আর জীবন মান উন্নত হবে। 

জেলার সংখ্যা বিশ্লেষণ করলে, জামালপুর, ময়মনসিংহ,কিশোরগঞ্জ, গাজীপুর , নরসিংদী জেলা সংশ্লিষ্ট  নদী তীরবর্তী দুই পাড়ের মানুষের ৫০ লাখ মানুষের বসবাস। তবে এই উৎসবমুখর আমেজের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক কালের খরস্রোতা ব্রহ্মপুত্রের করুণ বাস্তব চিত্র।

ঐতিহাসিকভাবে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ ছিল এই অঞ্চলের প্রাণভোমরা। এক সময় যার বিশাল বক্ষ দিয়ে ভেসে বেড়াতো বড় বড় মহাজনি পাল তোলা নৌকা ও জাহাজ, এই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল এই নদী পথেই, আজ কালের বিবর্তনমানে পলি জমে নদ থেকে মরা খালে রূপ নিয়েছে। ১৯২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই নদর তীরে বসবাসকারী প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কৃষি অর্থনীতি জীবনযাত্রা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই জলাধারের ওপর নির্ভরশীল ছিল, নদর নাব্যতা হ্রাস পেয়ে শুকনো মৌসুমে বিশাল বালুচরে রূপ নেয়, যা এই অঞ্চলের পুরো বাস্তবতন্ত্রকে বর্তমানে হুমকির মুখে ফেলেছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্র মতে,পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদী হচ্ছে ৩৭ নম্বর। এটি  ২০১৮ সালের নদ অ্যাটলাসে ‘সিভিয়ালি সিলটেড’ হিসেবে চিহ্নিত করে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নকশার মাঝে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, নদের তলদেশে ১০ ফুট পর্যন্ত পলি জমে আছে, প্রস্ত ১২-১৪ কিলোমিটার থেকে ১০০-২০০ মিটারে নেমেছে। কোন কোন জায়গায় শুষ্ক মৌসুমে মানুষ পায়ে হেঁটে নদ পার হওয়া যায়। সেই সঙ্গে নদের তীরে দুই পাশে অবৈধ স্থাপনা নদীর স্বাভাবিক সীমানা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে, ফলে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়াও ১৮৫৭ সালের বন্যা ও ভূমিকম্প নদীর গতি পরিবর্তন করে মূল স্রোত যমুনায় চলে গেছে, তাই এখন এটা মরা খালের মত।

মৎস্য অধিদপ্তর জানায়, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন বিগত ৮-১০ বছর ধরে পোড়াবাড়ি ঘাটে ময়লা ফেলছে। নরসিংদী ভৈরব অংশে শিল্প কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য, প্লাস্টিক ও গৃহস্থালী বর্জ্য সরাসরি নদে ফেলা হচ্ছে। দূষণের কারণে নদের পানিতে অক্সিজেনের লেভেল কমে যাওয়া নদতে মাছের ডিম ফুটে না।

নদীতে পানি নেই তারপরও একশ্রেণির মৎস্য শিকারীরা, কারেন্ট জাল, রিং জাল এবং ভয়ঙ্কর রূপে আবিষ্কার ব্যাটারির সাহায্যে ইলেকট্রিক শট দিয়ে রেনু পোনা ও মা মাছ অবাধে নিধন করে যাচ্ছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০০০ সালে বছরে ১২০০ মেট্রিক টন মাছ ধরা হতো। বর্তমানে ৫০ মেট্রিক টন এর নিচে নেমে এসেছে। দেশি প্রজাতি বোয়াল, চিতল, আইড়সহ আরও কয়েকটি প্রজাতি মাছ বিলুপ্তির পথে। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল দেশের মাছ উৎপাদনের ৪০ শতাংশ , বর্তমানে তা কমে ১০ শতাংশ নেমে এসেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বিআইডব্লিউটি বলছে,খনন ও ড্রেজিং এর মাধ্যমে  নদীর নাব্যতা উন্নয়ন পুনরুদ্ধার করতে পারলে পুরাতন এই নৌ রোড আবার চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এই অঞ্চলে নিয়োজিত প্রকৌশলীরা বলছেন, শুষ্ক মৌসুমে নদীর গভীরতা কমপক্ষে ১০ ফুট এবং খননকৃত চ্যানেলের প্রস্থ ৩০ ফুট করতে পারলে তাহলে লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক হবে।

পরিবেশবিদদের দাবি, নদী খনন করতে হবে সিএস ও মিউটেশন রেকর্ড অনুযায়ী যাতে নদীর সীমানা  স্থায়ীভাবে রক্ষা পায়।

আজ সে ঐতিহাসিক মহেন্দ্রক্ষণ এই পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের দুই তীরের বসবাসকৃত মানুষের, তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে আশা ব্যক্ত করছেন,পুরাতন ব্রহ্মপুত্র মরা নদী দীর্ঘদিনের হারানো যৌবন ফিরে আসবে নদীর দুই পাড়ের তীরবর্তী মানুষরা আবার চাষাবাদের পানি ফিরে পাবে, নদীতে নৌকা লঞ্চ চলবে, জেলেরা নদীতে মাছ পাবে এই আশায় দুই পাড়ের ৫০ লক্ষ মানুষের ভাগ্য প্রধানমন্ত্রীর একটি সিদ্ধান্তের ওপর।