ফটিকছড়িতে তিন দশক আলো ছড়িয়ে শিক্ষকের বিদায়

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির পূর্ব দৌলতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙিনায় রবিবার সকালটা ছিল অন্য রকম। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চলছিল, তবে বিদ্যালয়জুড়ে ছিল বিদায়ের আবহ। দীর্ঘ ৩২ বছর শিক্ষকতা শেষে প্রিয় সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা চৌধুরী। ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ ফটিকছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। এরপর কেটে গেছে তিন দশকের বেশি সময়। বদলেছে কর্মস্থল, বেড়েছে দায়িত্ব। এই দীর্ঘ সময়ে তার হাত ধরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য শিক্ষার্থী। সর্বশেষ পূর্ব দৌলতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ২০২৬ সালে অবসরে গেলেন তিনি।

দীর্ঘ কর্মজীবনে নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে শিক্ষকতা করেছেন গোলাম মোস্তফা চৌধুরী। বিদায় অনুষ্ঠানে সহকর্মীদের স্মৃতিচারণ ও অতিথিদের বক্তব্যে উঠে আসে তার কর্মজীবনের নানা দিক। ফুলেল শুভেচ্ছা, সম্মাননা, বক্তব্য আর স্মৃতিচারণে অনুষ্ঠানে তৈরি হয় আবেগঘন পরিবেশ। রবিবার (১৬ আগস্ট) সকালে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত বিদায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিদায়ী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা চৌধুরী। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মোহাম্মদ দিদারুল আলম। 

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন, ফটিকছড়ি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রব। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা রিসোর্স সেন্টারের ইন্সট্রাক্টর হোসাইন মোহাম্মদ এমরান, সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলা উদ্দিন, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ জহির আজম চৌধুরী, সাবেক এসএমসি সভাপতি সোহরাব জব্বার চৌধুরী, বাংলাদেশ প্রধান শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সভাপতি রনজিৎ কুমার ভট্টাচার্য, চট্টগ্রাম জেলা শাখার সহ-সভাপতি মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরীসহ শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

ফটিকছড়ি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রব বলেন, 'দীর্ঘ ৩২ বছরের শিক্ষকতা জীবনে গোলাম মোস্তফা চৌধুরী নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার অবসর শিক্ষকতা জীবনের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও শিক্ষাক্ষেত্রে তার অবদান সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বাংলাদেশ প্রধান শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সভাপতি রনজিৎ কুমার ভট্টাচার্য বলেন, একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো তার শিক্ষার্থীদের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব রাখা। দীর্ঘ কর্মজীবনে গোলাম মোস্তফা চৌধুরী যে দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন, তা নতুন প্রজন্মের শিক্ষকদের জন্য অনুসরণীয় হয়ে থাকবে।

বিদায়ী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, ৩২ বছরের শিক্ষকতা জীবনে এই বিদ্যালয়, সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি, তা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। বিদায়ের এই মুহূর্তে অনেক স্মৃতি মনে পড়ছে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকলে সবাই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আমার শিক্ষার্থীরা যেন ভালো মানুষ হয়ে দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করে—এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। 

অনুষ্ঠানে সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তাদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে একজন আন্তরিক শিক্ষক ও দায়িত্বশীল প্রধান শিক্ষক হিসেবে গোলাম মোস্তফা চৌধুরীর ভূমিকার কথা।

বক্তারা বলেন, শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি মানুষ গড়ার দায়িত্ব। চাকরির বয়স শেষ হলেও একজন শিক্ষকের প্রকৃত অবসর হয় না। তিনি থেকে যান শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে, সহকর্মীদের শ্রদ্ধায় এবং তার হাতে গড়ে ওঠা মানুষগুলোর জীবনে।

৩২ বছরের শিক্ষকতা শেষে তাই পূর্ব দৌলতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচিত শ্রেণিকক্ষ, মাঠ ও সহকর্মীদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন গোলাম মোস্তফা চৌধুরী। শেষ হলো তার কর্মজীবনের আনুষ্ঠানিক অধ্যায়। তবে শিক্ষার্থীদের জীবনে রেখে যাওয়া শিক্ষা, মূল্যবোধ ও স্মৃতির গল্পটি চলতে থাকবে আরও বহুদিন।