বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ, বিশ্বজুড়ে শিক্ষক-গবেষকদের উদ্বেগ

বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাসহ বিভিন্ন অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠন ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৭১ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, গবেষক, আইনজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী, লেখক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী।

এক যৌথ বিবৃতিতে তারা শিক্ষকদের মতপ্রকাশ ও একাডেমিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে এসব তদন্ত কমিটি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বিষয়টিতে বাংলাদেশ সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তারা।

বিবৃতিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে 'রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা' এবং টেলিগ্রাম গ্রুপে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগসহ বিভিন্ন কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে 'ফ্যাসিবাদবিরোধী শিক্ষক' ব্যানারে একদল শিক্ষক উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের কাছে নীল দলের ২৩১ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ জুলাই সিন্ডিকেট সভায় চার সদস্যের একটি সত্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়।

একই সভায় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের একজন অধ্যাপক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্যসহ তিন শিক্ষককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয় বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের নিয়োগ পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকের দুই বাক্যের ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে প্রক্টরিয়াল তদন্তের বিষয়টিও বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়েছে।

'রাজনৈতিক মতাদর্শ শাস্তির কারণ হতে পারে না'

বিবৃতিদাতারা বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকা বা রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের অধিকার আইনি কাঠামোয় স্বীকৃত। শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীকে তালিকাভুক্ত করে শাস্তির আওতায় আনা মানবাধিকারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তবে কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলে প্রচলিত বিধি ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে বলে তাঁরা মনে করেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, যারা শিক্ষকদের তালিকা তৈরি করছেন এবং বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক দায়িত্বে রয়েছেন, তাদের অনেকেরও রাজনৈতিক পরিচয় বা সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এমন অবস্থায় ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ঢালাও তদন্ত ও শাস্তির উদ্যোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরপেক্ষতা, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের আহ্বান

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে স্বাক্ষরকারীরা বলেন, শিক্ষকদের একাডেমিক স্বাধীনতা রক্ষা করা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাজনৈতিক মতাদর্শ বা ভিন্নমতের কারণে শিক্ষকদের শাস্তির মুখোমুখি করা হলে তা স্বাধীন জ্ঞানচর্চার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

তারা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের বিভিন্ন শিক্ষক সমিতি এবং Scholars at Risk-কে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে চলমান এসব পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণের অনুরোধ জানিয়েছেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, "বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক কমিউনিটিতে তাদের অবস্থান বর্তমান প্রশাসনের সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্যের ওপর নির্ভর করবে না; বরং তা নির্ভর করবে একাডেমিকদের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাতন্ত্র্য, স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের ওপর।"

স্বাক্ষরকারীদের মতে, এসব মূল্যবোধ রক্ষা শুধু বর্তমানে তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি শিক্ষকদের জন্য নয়, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ ও গণতান্ত্রিক পরিসরে স্বাধীন মত ও চিন্তার চর্চার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের প্রফেসর এমেরিটা ড. সুসান কলিন্স ও অধ্যাপক গ্যারি স্টিভেনস; জিএলএস ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ড. দেবাশীষ ঘোরুই; নর্থ ক্যারোলাইনা এঅ্যান্ডটি স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রফেসর এমেরিটাস ড. শামউদ্দিন ইলিয়াস; ইউনিভার্সিটি অব মাউন্ট অলিভের অধ্যাপক ড. কাজী এম. রহমান; কার্লটন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. ময়ূরিকা চক্রবর্তী ও সহকারী অধ্যাপক ড. গুলেয় কিলিচাসলান; অস্ট্রেলিয়ার আইনজীবী ও শিক্ষাবিদ ড. তুষার দাস; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের চেয়ারম্যান ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মাহবুবুল মুকাদ্দেম (আকাশ); ককেশাস ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক মানানা মাতিয়াশভিলি; ইউনিভার্সিটি অব আলাবামা অ্যাট বার্মিংহামের সহকারী অধ্যাপক ড. শেখ ইস্কান্দার এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক ডেভিড লুইস।

আরও স্বাক্ষর করেছেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর সাবেক ভিজিটিং প্রফেসর ড. আবদুল আউয়াল; নর্থামব্রিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বিদিত দে; ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. শুভ বসু; কার্লটন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. চিন্নাইয়াহ জঙ্গম; অ্যাস্টন অ্যাস্টন ইউনিভার্সিটির ড. মো. হানিফ সিদ্দি সিদ্দিকী; লামার ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ড. মো. রাকিবুল ইসলাম; মানবাধিকারকর্মী শ্রাবণী এন্ডো চৌধুরী; ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টার ড. অমলেশ ধর; আইনের অধ্যাপক ড. এস. এম. মাসুম বিল্লাহ; লেখক লুৎফর রহমান রিটন; ব্যারিস্টার তাপস কান্তি বল এবং ইতিহাসের শিক্ষক রানা ইয়াসমিন।

স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে আরও রয়েছেন আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার জয়েন্ট ডিরেক্টর জেনারেল ড. মধুলিকা সামন্ত; সুইডেনের দ্য সেন্টার ফর লিটারেচারের পাবলিক এডুকেটর আনিসুর রহমান; লেখক ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক আবদুল্লাহ আল ইমরান; সমাজ-আইনবিষয়ক গবেষক ড. অর্পিতা এস. মিজান; নর্থ ক্যারোলাইনা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. এ. বি. এম. নাসির; ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডোর অধ্যাপক ড. ফরিদা সি. খান; ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস বোস্টনের অধ্যাপক ড. ইলোরা চৌধুরী; ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. গিয়াস উদ্দিন; ইউনিভার্সিটি অব হালের ড. লুবনা ফেরদৌসী; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক; আলগনকুইন কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ওমর সেলিম শের; লেখক ও সাংবাদিক সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল এবং অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক হোসাইন মনসুর।

এ ছাড়া স্বাক্ষর করেছেন লামার ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ড. শালিনা শাহিন; লেখক ও মানবাধিকারকর্মী আফসানা কিশোয়ার; ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ড. মাজহারুল ইসলাম; মানবাধিকারকর্মী ফয়েজ খান তৌহিদ; বোস্টন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. নাজলি কিবরিয়া; গবেষক ড. ফাইয়াজ আল জামাল; নর্থ ক্যারোলাইনা এঅ্যান্ডটি স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মাসুদুল বিশ্বাস; ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান দিয়েগোর গবেষক ড. নাদিম মাহমুদ; ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের ড. নওরিন তামান্না; আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ড. রায়হান রশিদ; আইন বিশেষজ্ঞ ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিন; কার্লটন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহমুদ হাসান এবং ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির ডক্টোরাল গবেষক আজিজুল রাসেল।

বিবৃতিতে আরও স্বাক্ষর করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. শামীম আহমেদ; আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী উম্মে হাবিবা ও পারভেজ হাশেম; ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক নিরু কে. নাহার; গবেষক ড. ইয়ামেন হক ও ড. ইমতিয়াজ মাসুদ; সেন্টার ফর বাংলাদেশ জেনোসাইড রিসার্চের গবেষক ও শিক্ষক ড. রায়হান জামিল; বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জীবনানন্দ জয়ন্ত; সাইকোথেরাপিস্ট বিলকিস নাহার; ক্রিট ইন্টারন্যাশনাল পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যালের ক্রিস্টোস কুকিস; কার্লটন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. কামাল হোসাইন; ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ডক্টোরাল গবেষক নাসরিন সুলতানা এবং ইউমাস অ্যামহার্স্টের ডক্টোরাল গবেষক গোপা বিশ্বাস সিজার।

এ ছাড়া রয়েছেন নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটির সাবেক সিনিয়র লেকচারার ড. মোহাম্মদ আবুল হাসনাত; কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী সুজন সেন গুপ্ত; কিংস কলেজ লন্ডনের অ্যাফিলিয়েট একাডেমিক ড. আশফাক এ. আলম; বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক সৌমিক নন্দী মজুমদার; ইউনিভার্সিটি অব আলাবামার ডক্টোরাল গবেষক মো. সাজ্জাদ হোসাইন; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজি বিভাগের সাবেক সহকারী অধ্যাপক ড. শামীমা কেকা এবং অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানী ও কলামিস্ট ড. এজাজ মামুন।