সুগন্ধি আমনের জাত ব্রিধান-৭৫

 

 

মো. আবদুর রহমান

আমন ধান ‘আগুনি ধান’ বা ‘হৈমন্তিক ধান’ নামেও পরিচিত। রোপা আমন মৌসুমে বিভিন্ন জাতের উচ্চফলনশীল আমন ধানের চাষ হয়ে থাকে। এদের মধ্যে ব্রিধান-৭৫ সুগন্ধি জাতের একটি উচ্চফলনশীল রোপা আমন ধান। এ জাতের ধানের চালে সামান্য সুগন্ধি আছে। তবে রান্না করার সময় সুগন্ধিটা অনেক বেশি পাওয়া যায়। ব্রিধান-৭৫-এর গড় ফলন ৪.৫ টন। তবে উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে হেক্টরে ৫.৫ টন পর্যন্ত ফলন দিতে পারে।

ব্রিধান-৭৫ জাতের ধানের বৈশিষ্ট্য

এ জাতের ধানের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি অধিক ফলনশীল এবং চালে সামান্য সুগন্ধি আছে। তবে রান্না করার সময় সুগন্ধিটা অনেক বেশি পাওয়া যায়। পূর্ণ বয়স্ক ধান গাছ ১০১-১১০ সে. মি. পর্যন্ত লম্বা হয়। ব্রিধান-৭৫ জাতের ধানের ডিগ পাতা খাড়া, চওড়া ও লম্বা এবং পাতার রঙ গাঢ় সবুজ। কা- শক্ত তাই হেলে পড়ে না এবং শিষ থেকে ধানও ঝরে পড়ে না। এ জাতের ধানের গড় জীবনকাল ১১০-১১৫ দিন। এর গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৪.৫ টন। তবে উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে ব্রিধান-৭৫ জাতটি হেক্টরে ৫.৫ টন পর্যন্ত ফলন দিতে পারে। এ জাতের ধানের দানার রঙ সোনালি এবং মাঝারি চিকন। এক হাজার পুষ্ট ধানের ওজন প্রায় ২১ গ্রাম।

চাষাবাদ পদ্ধতি

উপযোগী জমি ও মাটি : উঁচু ও মাঝারি উঁচু প্রকৃতির দো-আঁশ, পলি দো-আঁশ ও এঁটেল দো-আঁশ মাটি এ ধান চাষের জন্য নির্বাচন করতে হবে।

জমি তৈরি : মাটির প্রকার ভেদে ৪-৫ বার চাষ ও মই দিয়ে থকথকে কাদাময় করে জমি তৈরি করতে হবে। প্রথম চাষের পর অন্তত এক সপ্তাহ জমি ফেলে রাখতে হবে। এতে আগাছা ও পরিত্যক্ত খড় পচে খাদ্য উপাদান তৈরি হয়, যা গাছের বাড়-বাড়তিতে সহায়তা করে। উত্তমরূপে কাদা করা তৈরি জমিতে চারা রোপণ করতে সুবিধা হয়। এ ছাড়া কাদা করা জমিতে অক্সিজেনের শূন্য স্তর সৃষ্টি হওয়ার ফলে মাটির উর্বরতা এবং সার ব্যবহারের কার্যকারিতা বেড়ে যায়।

রোপা আমনের জমি সমতল করে তৈরি করা খুব জরুরি। জমি সমতল হলে সব জায়গায় বৃষ্টি বা সেচের পানি দাঁড়াতে পারে, পানির অপচয় কম হয় এবং সব গাছ ঠিকমতো পানি ও সার পায়। এতে ক্ষেতের সব জায়গায় ফসল ভালো হয়। তাই শেষ চাষের পর মই দিয়ে জমি ভালোভাবে সমতল করে নিতে হবে। সেই সঙ্গে আইলও মজবুত করে তৈরি করতে হয়। এতে বৃষ্টি বা সেচের পানি ক্ষেত থেকে বেরিয়ে অপচয় হতে পারে না বলে ফসলের কাজে লাগে ও ফলন বাড়ে।

সার ব্যবহার : ব্রিধান-৭৫ জাতের রোপা আমন ধান চাষে সারের মাত্রা অন্যান্য উচ্চফলনশীল জাতের চেয়ে ২০% কম লাগে। এ জাতের রোপা আমন ধান চাষের জন্য বিঘাপ্রতি ২০ কেজি ইউরিয়া, ১০ কেজি টিএসপি, ১১ কেজি এমওপি, ৮ কেজি জিপসাম ও জিংক, ১.৫ কেজি জিংক সালফেট সার প্রয়োগ করতে হয়। জমি শেষ চাষের সময় সবটুকু টিএসপি, এমওপি, জিপসাম ও জিংক সালফেট সার প্রয়োগ করে মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে

দিতে হবে।

জমি তৈরির সময় ইউরিয়া সার ব্যবহার করলে সারের অপচয় হয়। তাই ইউরিয়া সার সমান তিনভাগে ভাগ করে চারা রোপণের ১০-১২ দিন পর ১ম, ২০-২৫ দিন পর দ্বিতীয় এবং ৩৫-৪০ দিন পর তৃতীয় কিস্তিতে উপরি প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া সার দেওয়ার সময় মাটিতে প্রচুর রস থাকা দরকার। শুকনো জমিতে কিংবা ধান গাছের পাতায় পানি জমে থাকলে কখনো সার প্রয়োগ করা ঠিক নয়। ক্ষেতে বেশি পানি থাকলে তা বের করে দিয়ে ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করতে হয় এবং হাতড়িয়ে বা নিড়ানি দিয়ে মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। এতে সারের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সার প্রয়োগ করে ২-৩ দিন পরে পুনরায় জমিতে পানি ঢুকিয়ে দিতে হবে। যেসব ক্ষেতের পানি নিষ্কাশন বা সেচের সুবিধা নেই সেখানে ক্ষেতের পানিতে ইউরিয়া ছিটানোর ২ দিন পর সার মাটির সঙ্গে এমনভাবে মেশানো দরকার, যাতে পানি যথেষ্ট ঘোলা হয়।

চারা রোপণের সময় ও পদ্ধতি

সময়মতো রোপা আমন ধানের চাষ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। ব্রিধান-৭৫ জাতের আমন ধান ২১ জুলাই থেকে ২০ আগস্ট অর্থাৎ ৬ শ্রাবণ থেকে ৫ ভাদ্র তারিখের মধ্যে বীজ বপণ করে বীজতলা থেকে ২১-২৫ দিন বয়সের সুস্থ ও সবল চারা সাবধানে তুলে এনে রোপণ করতে হবে। তবে আগাম আলু বা সরিষা চাষ করতে চাইলে ৪ জুলাই অর্থাৎ ২০ আষাঢ় তারিখের মধ্যে বীজতলায় বীজ বপন করতে হবে। বীজতলা থেকে চারা উঠাবার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে, যাতে শিকড় না ছেঁড়ে। শিকড় বেশি ছিঁড়ে গেলে চারা মূল জমিতে লাগতে বেশি সময় নেবে।

চারা লাগানোর সময় জমিতে ছিপছিপে পানি থাকা প্রয়োজন। চারা তুলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মূল জমিতে রোপণ করা দরকার। এতে মূল জমিতে তাড়াতাড়ি চারা লেগে যায়। উত্তর-দক্ষিণে সারিতে চারা রোপণ করা উত্তম। এতে আগাছা দমন ও অন্যান্য পরিচর্যা সহজতর হয়। সারি থেকে সারি ২০  সে.মি. এবং চারা থেকে চারা ১৫ সে.মি. দূরত্বে চারা রোপণ করতে হবে। প্রতিটি গর্তে ২-৩টি সুস্থ ও সবল চারা ২.৫-৩.৫ সে.মি. গভীরে রোপণ করা উচিত। প্রতি ৮-১০ লাইন বা সারির পর এক সারি অর্থাৎ ২৫-৩০ সে.মি. ফাঁকা জায়গা রেখে পুনরায় পূর্ববর্তী নিয়মানুসারেই লোগো পদ্ধতিতে চারা রোপণ করতে হবে। চারা খুব গভীরে রোপণ করা হলে পুরনো শিকড় কাজ করতে পারে না এবং নতুন শিকড় মাটির ঠিক ওপরে যে পর্ব থাকবে সেখান থেকে বের হয়। একে বলে পর্ব শিকড়। এর ফলে গাছ তাড়াতাড়ি সেরে উঠতে পারে না। অপরদিকে খুব কম গভীরে চারা রোপণ করলে যদি জোরে বাতাস চারার ওপর দিয়ে বয়ে যায় তাহলে উঠে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই পরিমিত গভীরে চারা রোপণ করতে হবে। রোপণের ১০-১২ দিনের মধ্যে মরে যাওয়া চারার শূন্যস্থান একই জাতের চারা দিয়ে পূরণ করতে হবে। এজন্য রোপণ শেষে ক্ষেতের এক পাশে এক মুঠো চারা রেখে দিতে হয়।