ভুঁইফোড় সে। শুধু বনবাণী আনে না, আনে বাঙালিবাণীও। সে ধরা দেয় বনতলে, একদম হঠাৎ করেই। রূপকথার অদ্ভুত এক বর্ণিল পরী! আসে শান্তির দূত হয়ে চৈত্রদগ্ধসময়ে, বাঙালি যখন তার নতুন বছর শুরু করবে, ঠিক সে সময়টাতে ছুঁইছুঁই করে। হয়তো শালের সঙ্গে দোস্তি বানিয়ে তাদের তলে তলে, নয়তো কোনো পাহাড়ি বনের ঢালুতে-ঢালুতে আর কোলে অন্যান্য বিরুৎ-লতা-তৃণের সঙ্গে মিলেঝিলে।
পুষ্পদ-কে আগে আগে আলো-হাওয়াতে পাঠিয়ে দেয় তার স্বরূপ চেনাতে, কোনো রকম পাতা বা কা- না উঠিয়েই। মাটির নিচে এর প্রাণভোমরা চৈত্র-বৈশাখ পর্যন্ত একটু ‘শীতনিদ্রায়’ যায় প্রতি বছর ফুল-ফল দেওয়া শেষে, পাতা ও কা- শুকিয়ে বহিরাঙ্গে মরে গেলেও! পরের বছর সময়-সুযোগ মতো জেগে ওঠে এর বিস্ময়কর, ঝলমলে রঙিন মঞ্জরিদ-। এর মাধ্যমে সে যেন শুভেচ্ছা জানায় বাংলা নববর্ষকে শুভ নববর্ষ!
শটির আছে অনেক আঞ্চলিক নাম। ফইল্লা, খইল্লা, হডি, হুইট, ফুইট, গোয়াদা, ঘিকমা ছাড়াও কোথাও কোথাও বনহলুদ, আবার বার্লিগাছ বলেও একে ডাকা হয়। মারমা, চাকমা ও তঞ্চঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর লোকেরা একে আলাদা আলাদা নামে চেনে। এর ইংরেজি নাম তবফড়ধৎু, ডযরঃব ঃঁৎসবৎরপ। দ্বিপদী নাম ঈঁৎপঁসধ ুবফড়ধৎরধ, পরিবার তরহমরনবৎধপবধব।
লালচে, লালচে বেগুনি, সাদাটে বেগুনি, সাদাটে সবুজ এ রকম বিচিত্র রঙের কোলে ধরে এর ছোট ছোট কলসির মুখের মতো মুখ পেতে থাকা হলদে রঙের একেকটি ফুল। একেকটি মঞ্জরিতে ৬-৭টি ফুল থাকে। ফুলগুলো উপপত্র থেকে কিছুটা সামনের দিকে বেরিয়ে থাকে। উদ্ভিদটি বীরুৎশ্রেণির হলেও ঝোপালো গড়নের। রোমহীন পাতাগুলো বিশাল আকারের। ২০-৬০ সেমি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। শটির পাতার সংখ্যা মাত্র ৪-৬।
স্বাদে কিছুটা তিতা; আদার মতো কিছুটা ঝাঁজালোও। মুখে পুরে কিছুক্ষণ চিবুলে তিতকুটে ভাবটি প্রকট হয়। পাতাতেও এই তেতো ভাব আছে, যে কারণে গরু-ছাগল এর পাতায় মুখ দেয় না। কাঁচা আম, আদা আর গাজরের মিলিত গন্ধ পাওয়া যাবে এতে।
শটির কন্দ থেকে এক সময় আমাদের দেশে তৈরি হতো ‘পালো’ নামের খাদ্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যাপক চাহিদার কারণে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে এই খাদ্য বানানো হতো। এক সূত্র থেকে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন জেলায় তা কুটিরশিল্পের মতোই স্থান পেয়েছিল। বাচ্চাদের এই পালো খাওয়ানো হতো বার্লির বিকল্প হিসেবে।
আগেকার দিনে শটির পাতা দিয়ে গরিবঘরের থালা বানানো হতো। কিছুদিন আগেও বাংলার হাটবাজারগুলোতে লবণ ও গুড় বেঁধে বিক্রি হতো শটিপাতায়। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, ভুটান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এর দেখা মিলবে। তবে এর খাদ্যগুণ, ঔষধিগুণ কিংবা গাছ বা ফুলের প্রসিদ্ধির জন্যই হোক আর অন্য কোনো কারণেই হোক, এটা দুনিয়ার উষ্ণম-লীয় বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে গেছে বিস্তরভাবে। খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ সময়কালে অস্ট্রেলেশিয়ান জনগোষ্ঠী প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকা থেকে মাদাগাস্কার পর্যন্ত একে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করত বলে বিভিন্ন সূত্র জানাচ্ছে।
লোকচিকিৎসায় শটির ব্যবহার রয়েছে। বমি, পিপাসা, গা-গরম ও মাথা ধরায় শটিচূর্ণ গরম পানিতে ২-৩ ঘণ্টা ভিজিয়ে খেলে উপকার পাওয়া যায়। বাচ্চাদের
কৃমির উৎপাতে পেট ফুলে গেলে এ পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন চর্মরোগ, ডায়রিয়া, ফোড়া, প্লীহার বৃদ্ধি, অতিসারেও শটির শ্বেতসার বেশ কাজের। মিছরি ও মরিচের গুঁড়া শটিকন্দের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে শ্বাসকষ্ট ও কাশির হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়। তা ছাড়া ক্ষত, সন্তান প্রসবজনিত দৌর্বল্যে কন্দ ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে বাংলার বিভিন্ন জায়গায়। কিছুকাল আগেও এ উপমহাদেশের গায়ক-গায়িকারা গলা পরিষ্কার রাখা বা গলার উসখুস ভাব কাটাবার জন্য শটির কন্দ মুখে পুরে চিবাতেন। পটুয়াখালীতে শটির ময়দা দিয়ে পিঠা বানানোর রেওয়াজ আছে।