বছরে ক্ষতি আড়াই কোটি টাকা

গবাদিপশুর বড় হুমকি ব্রুসেলোসিস

খামারে যতœসহকারে লালন-পালন করা হচ্ছে গাভী। নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে সুষম খাবার, নিশ্চিত করা হচ্ছে প্রয়োজনীয় পরিচর্যা। বাইরে থেকে দেখলে গাভীটিকে সম্পূর্ণ সুস্থ বলেই মনে হয়। কিন্তু অজান্তেই তার শরীরে লুকিয়ে থাকতে পারে এক নীরব ক্ষতিকর রোগ। আর এই অদৃশ্য সংক্রমণের কারণে খামারির অজান্তে প্রতিদিনই কমে যাচ্ছে উৎপাদন, বাড়ছে অর্থনৈতিক ক্ষতি। বাংলাদেশের দুগ্ধ খামারগুলোর জন্য এমনই বড় হুমকি হয়ে উঠেছে গবাদিপশুর ‘ব্রুসেলোসিস’ রোগ।

নীরব রোগ যেভাবে দৃশ্যমান হলো

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষকের দুই বছরব্যাপী নিবিড় গবেষণায় গবাদিপশুর নীরব রোগ ব্রুসেলোসিসের ভয়াবহতার চিত্র উঠে এসেছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা জার্নাল ‘অ্যানিমেল ডিজিজ’-এ প্রকাশিত এ গবেষণায় প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে ব্রুসেলোসিসের সুপ্ত বা কোনো লক্ষণ ছাড়াই থাকা সংক্রমণের ভয়াবহ প্রভাব।

গবেষণার ফলাফল বলছে, সক্রিয় ব্রুসেলোসিসে আক্রান্ত একটি গাভী সুস্থ গাভীর তুলনায় দৈনিক গড়ে ১.০১ লিটার দুধ কম দেয়। আরও ভয়ংকর ব্যাপার হলো, কোনো বাহ্যিক লক্ষণ ছাড়াই সুপ্ত বা লুকিয়ে থাকা রোগে আক্রান্ত গাভীও দৈনিক গড়ে ০.৫৩ লিটার বা অর্ধেকের বেশি লিটার দুধ কম দিচ্ছে।

সরকারের লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (এলডিডিপি)-এর অর্থায়নে এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হয়। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের প্রধান দুধ উৎপাদনকারী অঞ্চলের ১৭টি বড় বাণিজ্যিক ডেইরি খামার থেকে মোট ২,৬৯৬টি দুগ্ধবতী গাভীর তথ্য ও দুধের নমুনা সংগ্রহ করেন গবেষকরা। গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন বাকৃবির মেডিসিন বিভাগের ল্যাবরেটরি অব এপিডেমিওলজি অ্যান্ড প্রিভেন্টিভ মেডিসিনের অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. আনিসুর রহমান। তার সঙ্গে ছিলেন একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সিদ্দিকুর রহমান, অধ্যাপক ড. এম. আরিফুল ইসলাম এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও পিএইচডি শিক্ষার্থী মো. শফিউল আলমসহ অনেকে।

এ ছাড়া রোগ শনাক্তের আধুনিক গাণিতিক পদ্ধতি নিয়ে এই দলের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছেন গ্রিসের থেসালি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বিশেষজ্ঞ লেফটেরিস মেলেটিস ও পলিক্রোনিস কস্তুলাস।

ল্যাবের আধুনিক পরীক্ষা এবং উন্নত গাণিতিক পদ্ধতি বা বায়েসিয়ান মিক্সড-ইফেক্টস মাল্টিনোমিয়াল রিগ্রেশন ব্যবহার করে গাভীগুলোকে সুস্থ, সুপ্ত সংক্রমণ এবং সক্রিয় ব্রুসেলোসিসে আক্রান্ত; এই তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়।

সাধারণত ব্রুসেলোসিস আক্রান্ত গরুকে কেবল ‘সুস্থ’ কিংবা ‘আক্রান্ত’ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এই গবেষণায় সুপ্ত সংক্রমণকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করার বিষয়ে প্রধান গবেষক অধ্যাপক আনিস বলেন, ‘ব্রুসেলোসিস সবসময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না। অনেক গরুর শরীরে রোগটি লুকিয়ে বা সুপ্ত অবস্থায় থাকে। বাইরে থেকে সুস্থ মনে হলেও ওই গরুর দুধ উৎপাদন কমছে এবং পরবর্তী সময়ে এই রোগ সক্রিয় হতে পারে।’

অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ

যখন ব্রুসেলোসিস রোগ সক্রিয় হয়, তখন গাভীর গর্ভপাত, গর্ভফুল আটকে যাওয়া এবং প্রজনন ব্যর্থতার মতো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বাচ্চা প্রসবের পর ফুল না পড়া বা ‘রিটেইন্ড প্লাসেন্টা’ ব্রুসেলোসিসের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিপূর্ণ কারণ। জীবাণুটি গাভীর জরায়ু ও গর্ভফুলের ব্যাপক ক্ষতি করে। ফলে গাভী সময়মতো প্রজননে সাড়া দেয় না এবং দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদনক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে দুধ উৎপাদনে। এই উৎপাদন হ্রাসের অর্থনৈতিক চিত্রটি রীতিমতো চমকে ওঠার মতো। গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বড় ডেইরি খামারগুলোতে ব্রুসেলোসিসের কারণে বছরে গড়ে প্রায় ২ কোটি ৪১ লাখ টাকার ক্ষতি হতে পারে, যার সিংহভাগই আসে দুধ উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে।

সতর্ক হতে হবে আগে থেকেই

খামারিদের প্রতি পরামর্শ দিয়ে অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. আনিসুর রহমান বলেন, খামারিরা সাধারণত গাভীর গর্ভপাত হলেই ব্রুসেলোসিসের কথা ভাবেন। কিন্তু লক্ষণহীন সুপ্ত রোগের কারণেও প্রতিদিন গাভীপ্রতি প্রায় আধা লিটার দুধ কমছে। সক্রিয় রোগ হলে ক্ষতি এক লিটার বা তারও বেশি। ফলে খামারিরা বুঝতে না পেরেই প্রতিদিন বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তাই খামারে গর্ভপাত, গর্ভফুল আটকে যাওয়া, গাভী প্রজননে সাড়া না দিলে বা বারবার প্রজননে ব্যর্থতা দেখলে দেরি না করে ভেটেরিনারিয়ানদের পরামর্শ নিয়ে পরীক্ষা করানো উচিত।

ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এই গবেষণায় বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার খরচ ও লাভের হিসাবও তুলে ধরা হয়েছে। অধ্যাপক আনিস জানান, পরিকল্পিত গণটিকাদানই হলো সবচেয়ে লাভজনক ব্যবস্থা। এই পদ্ধতিতে প্রতি ১ টাকা বিনিয়োগে গড়ে ৮ টাকা ১৪ পয়সা পর্যন্ত ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। অন্যদিকে আক্রান্ত গরু শনাক্ত করে খামার থেকে বাদ দেওয়ার পদ্ধতিটি সরকারি ক্ষতিপূরণ না

থাকলে সাধারণ খামারিদের জন্য বেশ ব্যয়বহুল।

কেবল অর্থনীতির জন্যই নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও ব্রুসেলোসিস একটি বড় হুমকি। গবেষকরা সতর্ক করে বলেন, এটি একটি বিপজ্জনক জুনোটিক রোগ। আক্রান্ত গরুর কাঁচা দুধ পান করা বা সংক্রমিত প্রাণীর সংস্পর্শে এলে মানুষও এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। বাংলাদেশে ব্রুসেলোসিস নিয়ন্ত্রণে উচ্চ ঝুঁকির গাভী দ্রুত শনাক্তকরণ, নিয়মিত রোগ নজরদারি এবং প্রজননস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার করার ওপর জোর দিয়েছেন গবেষকরা। একই সঙ্গে বড় খামারের পাশাপাশি দেশের ছোট ছোট খামারগুলোতেও এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তারা।

লেখক : শিক্ষার্থী, তৃতীয় বর্ষ,  শিক্ষার্থী, ভেটেরিনারি অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ