সেপা: আইসিটি, সেমিকন্ডাক্টর ও বাংলাদেশের তরুণদের নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি—সেপা (Comprehensive Economic Partnership Agreement–CEPA) নিয়ে আলোচনা যদি শুধু তৈরি পোশাকের শুল্ক সুবিধা, কোরিয়ান গাড়ি, ইলেকট্রনিকস কিংবা দুই দেশের পণ্যবাণিজ্য বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় ।বাংলাদেশের জন্য সেপার সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে এমন কিছু খাতে সেগুলো হচ্ছে  ‘মানুষের মেধা, সফটওয়্যার কোড, প্রকৌশল নকশা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান’বিশেষ করে সফটওয়্যার (Software), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence–AI), ক্লাউড (Cloud), সাইবার নিরাপত্তা (Cybersecurity), ডিজিটাল সেবা (Digital Services), এমবেডেড সিস্টেম (Embedded Systems) এবং সেমিকন্ডাক্টর (Semiconductor) । আইসিটি-সেমিকন্ডাক্টরকে যদি বাংলাদেশ–কোরিয়া সেপার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে আনা যায়, তাহলে আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরে বাংলাদেশের সামনে সম্পূর্ণ নতুন একটি সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।এটি শুধু রপ্তানি আয়ের সম্ভাবনা নয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকবে উচ্চ দক্ষতার কর্মসংস্থান, বৈদেশিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জন এবং একটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি তৈরির সুযোগ।

সেপাকে শুধু বাণিজ্য চুক্তি হিসেবে দেখলে চলবে না

‘সেপা’ প্রকাশিত কাঠামোতে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যবাণিজ্যের পাশাপাশি সেবা খাত, ডিজিটাল রূপান্তর (Digital Transformation), শিল্প সহযোগিতা, অবকাঠামো, সরবরাহব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন (Supply Chain), জ্বালানি এবং নতুন অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।এই জায়গাতেই বাংলাদেশের সামনে বড় সুযোগ। আমাদের এখন শুধু দেখা উচিত নয়— কোন পণ্যের ওপর কত শতাংশ শুল্ক কমবে?এর পাশাপাশি সর্বোচ্চ বিবেচনায় রাখা উচিত -
•    কতজন বাংলাদেশি সফটওয়্যার প্রকৌশলী কোরিয়ান প্রযুক্তি খাতে কাজ করার সুযোগ পাবেন?
•    কতটি কোরিয়ান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে রিসার্স এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার স্থাপন করবে?
•    কতজন বাংলাদেশি সেমিকন্ডাক্টর প্রকৌশলী আন্তর্জাতিক চিপ ডিজাইন প্রকল্পে যুক্ত হতে পারবেন?
•    বাংলাদেশ থেকে বছরে কত কোটি ডলারের সফটওয়্যার ও প্রকৌশলসেবা কোরিয়ায় রপ্তানি করা সম্ভব হবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই দীর্ঘমেয়াদে সেপার সুদৃঢ় প্রসারী অর্থনৈতিক গুরুত্ব নির্ধারণ করতে সহায়ক হবে ।

আইসিটি হতে পারে বাংলাদেশের বড় সুযোগ

আইসিটি শিল্পের একটি বিশেষ সুবিধা রয়েছে। এখানে একটি বড় কারখানা নির্মাণ, বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি কিংবা বিশাল অবকাঠামো তৈরির প্রয়োজন হয় না।প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি, আন্তর্জাতিক মানের সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট প্রসেস, নিরাপদ তথ্যব্যবস্থা, ক্লাউড অবকাঠামো, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং বৈশ্বিক গ্রাহকের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা।

বাংলাদেশ–কোরিয়া সেপার মাধ্যমে কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে নিচের কেন্দ্রগুলো স্থাপনে উৎসাহিত করা যেতে পারে—
•    সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (Software Development Center)
•    এআই ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (AI Development Center)
•    কোয়ালিটি অ্যাশিওরেন্স সেন্টার (Quality Assurance Center)
•    ক্লাউড অপারেশন সেন্টার (Cloud Operation Center)
•    গ্লোবাল ডেলিভারি সেন্টার (Global Delivery Center)
•    সাইবার সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার এবং গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র

ধরা যাক, একটি মাঝারি আকারের কোরিয়ান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার, এআই অ্যাপ্লিকেশন, ক্লাউড অপারেশন কিংবা সফটওয়্যার পরীক্ষণের কিছু কাজ বাংলাদেশ থেকে পরিচালনা করছে।কোরিয়ান প্রতিষ্ঠান পাবে তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক ব্যয়ে দক্ষ প্রকৌশলী। বাংলাদেশ পাবে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা। কিন্তু এর সবচেয়ে বড় অর্জন হবে প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন।

একজন প্রকৌশলীর অভিজ্ঞতাও দেশের সম্পদ

একজন বাংলাদেশি প্রকৌশলী যদি কোনো কোরিয়ান এআই, অটোমোবাইল, স্মার্ট ফ্যাক্টরি বা সেমিকন্ডাক্টর প্রকল্পে তিন থেকে পাঁচ বছর কাজ করেন, তাহলে বাংলাদেশের অর্জন শুধু ওই প্রকৌশলীর পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রায় সীমাবদ্ধ থাকে না।
তিনি দেশে ফিরিয়ে আনেন—
•    আন্তর্জাতিক মানের সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট প্রসেস 
•    মান নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি
•    জটিল প্রযুক্তি সমাধানের দক্ষতা
•    আধুনিক প্রযুক্তির টেকনোলজি আর্কিটেকচার (Technology Architecture)
•    আন্তর্জাতিক প্রকল্প ব্যবস্থাপনা
•    রিসার্চ ও ডেভেলপমেন্ট প্রসেস 
•    বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা

অর্থনীতির ভাষায় এ ধরনের জ্ঞান ছড়িয়ে পড়াকে নলেজ স্পিলওভার (Knowledge Spillover) বলা হয়।একজন অভিজ্ঞ প্রকৌশলী ভবিষ্যতে বাংলাদেশে ফিরে একটি নতুন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও তৈরি করতে পারেন। তার সঙ্গে আরও ২০, ৫০ কিংবা ১০০ জনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।এ কারণেই প্রযুক্তি খাতে দক্ষ মানুষের আন্তর্জাতিক চলাচলকে শুধু প্রবাসী কর্মসংস্থান হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় সক্ষমতা অর্জনের একটি প্রক্রিয়া।

দরকার ‘কোরিয়া–বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভিসেস করিডর’ 

সেপা’র অধীনে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়া যৌথভাবে একটি কোরিয়া–বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভিসেস করিডর (Korea–Bangladesh Digital Services Corridor) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে পারে।এর উদ্দেশ্য হবে বাংলাদেশের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং কোরিয়ান কোম্পানিগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি করা। এই করিডরের আওতায় কাজ হতে পারে—এআই অ্যাপ্লিকেশন, এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার, ফিনটেক (Fintech), স্মার্ট ফ্যাক্টরি (Smart Factory), ইন্টারনেট অব থিংস বা আইওটি (Internet of Things–IoT), সাইবার নিরাপত্তা,ক্লাউড ব্যবস্থাপনা,ই-গভর্নমেন্ট (E-Government),ডেটা ইঞ্জিনিয়ারিং (Data Engineering), এমবেডেড সফটওয়্যার নিয়ে ।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশের শুধু স্যামসাং, এলজি, এসকে বা হুন্দাইয়ের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না।দক্ষিণ কোরিয়ায় বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বা এসএমই (Small and Medium Enterprise–SME) রয়েছে, যারা আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি অংশীদার, সফটওয়্যার উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান এবং দক্ষ প্রকৌশলী খুঁজছে। বাংলাদেশের জন্য এই বাজারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কোরিয়ার এসএমই বাজারে প্রবেশের আলাদা ব্যবস্থা দরকার

বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক ভালো সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান কোরিয়ান বাজারে প্রবেশ করতে গিয়ে কয়েকটি সমস্যার মুখোমুখি হয়—ভাষাগত বাধা,স্থানীয় পরিচিতির অভাব,কোরিয়ান ক্রয়ব্যবস্থা সম্পর্কে সীমিত ধারণা,প্রযুক্তি অংশীদার খুঁজে পাওয়ার সমস্যা, পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি।

সেপার আওতায় একটি কোরিয়া–বাংলাদেশ টেকনোলজি বিজনেস ম্যাচিং প্ল্যাটফর্ম (Technology Business Matching Platform) প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। এখানে দুই দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো যৌথভাবে প্রকল্প খুঁজবে, দরপত্রে অংশ নেবে এবং কনসোর্টিয়াম (Consortium) তৈরি করতে পারবে।বাংলাদেশের সফটওয়্যার কোম্পানিকে শুধু কম খরচের আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তি অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই হওয়া উচিত লক্ষ্য।

কর্মসংস্থানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে ‘মোড ফোর’

বাংলাদেশের তরুণ পেশাজীবীদের জন্য সেপার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হতে পারে মোড ফোর (Mode 4) বা মুভমেন্ট অব ন্যাচারাল পারসনস (Movement of Natural Persons)।সহজভাবে বললে, কোনো দেশের একজন দক্ষ পেশাজীবী একটি সেবা বা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অন্য দেশে গিয়ে কাজ করার সুযোগ পেতে পারেন। এটি সাধারণ অভিবাসন নয় এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থাও নয়। বরং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক প্রকল্প কিংবা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ পেশাজীবীর সাময়িক চলাচলের ব্যবস্থা।

এখানে দক্ষিণ কোরিয়া–ভারত সেপা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে। ভারত–কোরিয়া সেপায় বিভিন্ন পেশাজীবীর চলাচলের বিষয়ে আলাদা কাঠামো রাখা হয়েছিল। বাংলাদেশকেও তাই সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি পেশাজীবীদের জন্য একটি শক্তিশালী প্রফেশনাল মোবিলিটি (Professional Mobility) ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করতে হবে।

কোন পেশাগুলো অগ্রাধিকার পেতে পারে

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কয়েকটি প্রযুক্তি পেশাকে বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে—সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার (Software Engineer),এআই ইঞ্জিনিয়ার (AI Engineer),ডেটা ইঞ্জিনিয়ার (Data Engineer),ক্লাউড আর্কিটেক্ট (Cloud Architect),সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ,এমবেডেড ইঞ্জিনিয়ার (Embedded Engineer),সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার,ভেরিফিকেশন ইঞ্জিনিয়ার (Verification Engineer),ডিএফটি ইঞ্জিনিয়ার (DFT Engineer),ফিজিক্যাল ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার (Physical Design Engineer),সেমিকন্ডাক্টর টেস্টিং ও প্যাকেজিং বিশেষজ্ঞ।এই ধরনের পেশাজীবীদের জন্য যোগ্যতার স্বীকৃতি, নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের স্পনসরশিপ এবং দ্রুত ভিসা প্রক্রিয়া থাকলে বাংলাদেশের হাজারো তরুণের সামনে নতুন কর্মসংস্থানের বাজার তৈরি হতে পারে।

একটি ‘সেপা টেক প্রফেশনাল’ ব্যবস্থা কি সম্ভব?

দুই দেশ চাইলে সেপা বাস্তবায়নের আওতায় একটি টেকনোলজি প্রফেশনাল মোবিলিটি ফ্রেমওয়ার্ক (Technology Professional Mobility Framework) তৈরি করতে পারে। এর উদ্দেশ্য হবে কোরিয়ান কোম্পানির প্রয়োজন অনুযায়ী যোগ্য বাংলাদেশি প্রযুক্তি পেশাজীবীদের স্বচ্ছ এবং দ্রুত প্রক্রিয়ায় সাময়িক কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া। এটি চাইলে একটি ফাস্ট-ট্র্যাক প্রফেশনাল মোবিলিটি (Fast-track Professional Mobility) ব্যবস্থার রূপ নিতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে, একজন বাংলাদেশি সেমিকন্ডাক্টর প্রকৌশলী কোনো কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানে চাকরি বা প্রকল্পের সুযোগ পেলেন। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, কাজের অভিজ্ঞতা এবং নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের তথ্য যদি আগে থেকেই নির্ধারিত কাঠামোয় যাচাই করা যায়, তাহলে দীর্ঘ ও অনিশ্চিত প্রক্রিয়ার পরিবর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।একইভাবে কোরিয়ান বিশেষজ্ঞদের বাংলাদেশে এসে প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং প্রযুক্তি স্থাপনের ক্ষেত্রেও সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। তখন মানুষের চলাচল হবে দুইমুখী, আর প্রযুক্তিগত জ্ঞানও ছড়িয়ে পড়বে দুই দেশে।

সেমিকন্ডাক্টর: কোরিয়া কেন বাংলাদেশের জন্য বিশেষ অংশীদার?

দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর শক্তি। দেশটির রয়েছে স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ও এসকে হাইনিক্সের মতো বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান, শক্তিশালী গবেষণা অবকাঠামো, দক্ষ প্রকৌশলী, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা এবং বিস্তৃত সেমিকন্ডাক্টর শিল্প-পরিবেশ বা সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম (Semiconductor Ecosystem)।

অন্যদিকে বাংলাদেশের রয়েছে একটি বড় তরুণ জনগোষ্ঠী, প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া বিপুল সংখ্যক ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিকস, কম্পিউটার ও সফটওয়্যার প্রকৌশলী এবং তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক প্রকৌশল ব্যয়। এই দুই সক্ষমতাকে যুক্ত করতে পারলে একটি নতুন টেকনোলজি ভ্যালু চেইন (Technology Value Chain) তৈরি হতে পারে। কোরিয়ার থাকবে উন্নত প্রযুক্তি, শিল্প অভিজ্ঞতা ও বাজার। বাংলাদেশ দিতে পারবে দক্ষ প্রকৌশলী, ডিজাইন সেবা, সফটওয়্যার এবং ভবিষ্যতে টেস্টিং ও প্যাকেজিং সক্ষমতা।

শিক্ষার্থীদের কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ দরকার

একজন প্রকৌশল শিক্ষার্থী যদি স্নাতক শেষ করার আগেই কোনো কোরিয়ান প্রযুক্তি বা সেমিকন্ডাক্টর প্রতিষ্ঠানে ছয় মাসের ইন্টার্নশিপ (Internship) করতে পারেন, তার কর্মসংস্থানের সক্ষমতা কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে।সেপার আওতায় কোরিয়া–বাংলাদেশ টেকনোলজি ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম, শিক্ষার্থী বিনিময়, শিক্ষক বিনিময় এবং যৌথ গবেষণা কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। প্রতি বছর যদি ৫০০ থেকে ১,০০০ বাংলাদেশি প্রকৌশল শিক্ষার্থী কোরিয়ার বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের সুযোগ পান, তাহলে পাঁচ বছরে একটি উল্লেখযোগ্য দক্ষ জনশক্তির ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব।

প্রযুক্তি স্থানান্তর মানে শুধু মেশিন কেনা নয়

বাংলাদেশে টেকনোলজি ট্রান্সফার (Technology Transfer) বা প্রযুক্তি স্থানান্তর কথাটি আমরা প্রায়ই ব্যবহার করি। কিন্তু বিদেশ থেকে একটি মেশিন কিনে এনে কারখানায় বসানোই পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তি স্থানান্তর নয়।প্রকৃত প্রযুক্তি স্থানান্তর তখনই ঘটে, যখন বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা—
•    নিজেরা ডিজাইন করতে শেখেন
•    প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান করেন
•    উৎপাদন প্রক্রিয়া আয়ত্ত করেন
•    নতুন মেধাস্বত্ব তৈরি করেন
•    একসময় নিজেদের প্রযুক্তিপণ্য তৈরি করতে সক্ষম হন

সেপার আওতায় তাই জয়েন্ট আর অ্যান্ড ডি (Joint R&D) বা যৌথ গবেষণা ও উন্নয়ন, বিশ্ববিদ্যালয়–শিল্প গবেষণা, পেটেন্ট সহযোগিতা, গবেষক বিনিময়, স্টার্টআপ ইনকিউবেশন এবং কো-ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (Co-development Programme) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।বাংলাদেশকে শুধু “মেড ইন বাংলাদেশ (Made in Bangladesh)” নয়, ধীরে ধীরে “ডিজাইন্ড ইন বাংলাদেশ (Designed in Bangladesh)” এবং “ইঞ্জিনিয়ার্ড ইন বাংলাদেশ (Engineered in Bangladesh)” পরিচয়ও তৈরি করতে হবে।

কোরিয়ায় বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের ধারণাটিও বদলাতে হবে

দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণত উৎপাদন, নির্মাণ কিংবা অন্যান্য শ্রমঘন পেশার কথাই বেশি আসে। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ–কোরিয়া সম্পর্ককে এখানে পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—একদিকে প্রচলিত কর্মসংস্থান অব্যাহত রাখা, অন্যদিকে সফটওয়্যার প্রকৌশলী, এআই বিশেষজ্ঞ, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, ক্লাউড প্রকৌশলী এবং সেমিকন্ডাক্টর প্রকৌশলীদের জন্য নতুন উচ্চদক্ষতার কর্মসংস্থান পথ তৈরি করা।

বাংলাদেশি তরুণ যদি কোরিয়ার একটি বিশ্বমানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পাঁচ বছর কাজ করেন, তিনি শুধু নিজের পরিবারের আর্থিক অবস্থাই পরিবর্তন করেন না; তিনি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রযুক্তি শিল্পের জন্যও একটি সম্পদ হয়ে ওঠেন। এই ধারাবাহিক প্রভাবকেই বলা যায় মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট (Multiplier Effect)। আর জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই।

সেপা হতে পারে একটি প্রজন্ম পরিবর্তনের সুযোগ

“বাংলাদেশ–দক্ষিণ কোরিয়া সেপার সবচেয়ে বড় অর্জন হতে পারে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা, যারা শুধু দেশের প্রযুক্তি খাতেই নয়, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি শিল্পেরও সক্রিয় অংশীদার হবে।বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সেপা নিঃসন্দেহে একটি বড় বাণিজ্যিক সুযোগ। যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন হলে এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

একজন বাংলাদেশি তরুণের লেখা সফটওয়্যার কোড, তৈরি করা একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল, নকশা করা একটি সেমিকন্ডাক্টর চিপ, অর্জিত একটি পেটেন্ট কিংবা পৃথিবীর অন্য প্রান্তের কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য উদ্ভাবিত একটি জটিল প্রযুক্তিগত সমাধান—এসবই হতে পারে সেপার সাফল্যের কিছু প্রতিচ্ছবি।পাঁচ থেকে সাত বছর পর সেপার সাফল্য শুধু দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ কত বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাল, তা দিয়ে শুধু পরিমাপ করা উচিত হবে না; বরং দেখতে হবে—এই চুক্তি বাংলাদেশের কত তরুণের দক্ষতা বাড়াল, কত নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করল, কতজনকে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করল এবং সর্বোপরি কত মানুষের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারল।

লেখক: এম এন ইসলাম, প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, টিকন সিস্টেম লিমিটেড( প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটি কার্যালয় কোরিয়া, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে )।