আগুনে ৯ জনের মৃত্যু

কলকাতায় অপরিসর গলিতে বেআইনি হোটেল নিয়ে প্রশ্ন

কলকাতার একটি হোটেলে আগুনে পুড়ে ৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় প্রাথমিক তদন্তে হোটেলের চারতলার একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি অপরিসর গলির মধ্যে থাকা এই ধরণের চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও বেআইনি হোটেলগুলোকে কীভাবে ট্রেড লাইসেন্স ও ফায়ার পারমিট দেওয়া হয়েছিল তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। 

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার নিউ মার্কেটের সংলগ্ন মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি বেসরকারি হোটেল ‘শিখা ইন’ এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ছয়জনের পরিচয় নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। শনাক্ত হওয়া ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনই বাংলাদেশি নাগরিক, আর একজন ভারতের ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা। নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে রাখা হয়েছে। বাকি তিনজনের পরিচয় শনাক্তে কাজ করছে পুলিশ। খবর ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম।

অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানো বাংলাদেশিদের মধ্যে রয়েছেন সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত (৩৯), তার স্ত্রী আফসানা শারমীন (২৭), তাদের তিন বছরের শিশুসন্তান স্বর্ণশীষ দত্ত এবং দেবাশীষের শ্বশুর মো. আকরাম আলি (৬৪)। দেবাশীষ দত্ত কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা দিলীপ দত্তের ছেলে। তিনি দৈনিক ‘আজকের পত্রিকা’ ও টেলিভিশন চ্যানেল ‘চ্যানেল নাইন’-এর কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি স্থানীয় দৈনিক ‘আজকের আলো’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। তার শ্বশুর আকরাম আলির বাড়ি শহরের থানাপাড়া এলাকায়।

 

 

খবর এনডিটিভি ডটকম ও  ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, নিহতদের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, দুজন নারী ও একটি শিশু রয়েছে, যারা মূলত চিকিৎসার প্রয়োজনে কলকাতায় এসে ওই হোটেলে অবস্থান করছিলেন। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় বিষাক্ত ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আরও একাধিক আবাসিক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, যাদের দ্রুত উদ্ধার করে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

বুধবার ভোর ৩টার দিকে হোটেলটিতে আগুন লাগার পরপরই চারদিকে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বেশিরভাগ অতিথি সে সময় ঘুমিয়ে ছিলেন। ভবনে কোনো জরুরি নির্গমন পথ (ইমার্জেন্সি এক্সিট) না থাকা এবং প্রধান সিঁড়িটি অত্যন্ত সংকীর্ণ হওয়ায় হুড়োহুড়ির মধ্যে অনেকেই ভেতরে আটকা পড়েন।

খবর পেয়ে পুলিশ ও দমকল বাহিনীর একাধিক ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় দুই ঘণ্টার প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। হোটেল থেকে অন্তত ৬০ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে মিলে ৯ জনের মৃত্যু হয়।

 

চিকিৎসকরা জানান, নিহতদের শরীরে আগুনের সামান্য ক্ষত থাকলেও তাদের প্রত্যেকের মৃত্যুর প্রধান কারণ ফুসফুসে অতিরিক্ত ধোঁয়া প্রবেশ করা।

দুর্ঘটনার পর থেকেই হোটেলের মালিক ও পরিচালনাকারীরা পলাতক রয়েছেন। বুধবার সকালে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এবং শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়। তারা উদ্ধারকাজের সার্বিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন এবং উপস্থিত শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন।

বুধবার (১৯ আগস্ট) সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে তৎকালীন পুর প্রশাসন ও কলকাতা পুরসভার তীব্র সমালোচনা করেন পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। নাম না করে কলকাতার সাবেক মেয়র ফিরহাদ হাকিমকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘কীভাবে এমন অপরিসর রাস্তায় নিয়ম বহির্ভূতভাবে বেআইনি হোটেলগুলোকে ট্রেড লাইসেন্স ও ফায়ার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল?’

‘গত ১৫ বছরে এই সমস্ত হোটেলের কোনো নিয়মিত ফায়ার অডিট কেন করা হয়নি? বিদ্যুত সরবরাহকারী সংস্থা সিইএসসি বা কীভাবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান করল’, আরও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

 

অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, ‘স্থানীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, হোটেলের পেছনে বেরোনোর জন্য একটি বিকল্প পথ ছিল, কিন্তু সেখানেও অবৈধভাবে নতুন ভবন তুলে তা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই অব্যবস্থাপনা ও প্রাণহানির দায় সম্পূর্ণভাবে পূর্বতন সরকারকেই নিতে হবে।’

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কিছু দিন আগে তারাপীঠের হোটেলে যে ধরণের অগ্নিনির্বাপক গাফিলতি দেখা গিয়েছিল, মির্জা গালিব স্ট্রিটেও ঠিক একই অনিয়ম ও চরম অবহেলার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জামের অভাব এবং সুরক্ষাবিধি মেনে না চলার ফলেই এই করুণ পরিণতি।

বর্তমানে পুরো মির্জা গালিব স্ট্রিট ও সংলগ্ন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ঘটনার বিস্তারিত তদন্তে নেমেছে পুলিশ ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। নিহতদের সুনির্দিষ্ট পরিচয় শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে।