স্ট্রেচারের কাপড়ে ঢাকা প্রিয়জনের নিথর দেহ নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন স্বজনরা, বুকফাটা হাহাকার আর লাশঘরের গন্ধের মাঝে গরমে বিকৃত হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছে প্রিয় মুখগুলো। যে মানুষটি চলে যাওয়ায় পুরো পরিবার শোকে স্তব্ধ, শেষ বিদায়ের আগে সেই চেনা মুখটি প্রাণভরে দেখার সুযোগও কেড়ে নিচ্ছে নিষ্ঠুর বাস্তবতা। জেনারেল হাসপাতাল আর থানা চত্বরে প্রায়শই দেখা মিলছে এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা।
দেশের প্রাচীনতম জেলা পাবনা। আর এই জেলা জুড়ে প্রায় ৩০ লাখ মানুষের বসবাস। অথচ একটি আধুনিক হিমঘর না থাকায় শেষ যাত্রাতেও মরদেহ নিয়ে ভোগান্তিতে পরতে হচ্ছে স্বজনদের। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আধুনিক মর্গ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও মামলা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি মর্গটি। ফলে সেই একই ভোগান্তি পোহাচ্ছেন পাবনাবাসী।
হাসপাতাল ও গণপূর্ত সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাবনা জেনারেল হাসপাতাল আঙিনায় ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক মর্গ ও হিমঘর নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল। গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে ৬ মাস মেয়াদি এই প্রকল্পের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে প্রায় ৮০ শতাংশ শেষও করা হয়। কিন্তু ভবনের অবস্থান নিয়ে স্থানীয় কিছু মানুষের অযৌক্তিক আপত্তির মুখে বাধাগ্রস্ত হয় নির্মাণ কাজ। একপর্যায়ে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্ট দুই মাসের স্থগিতাদেশ দিলে কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে স্থগিতাদেশের মেয়াদ পেরিয়ে গেলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও আইনি দীর্ঘসূত্রতায় আর এক কদমও এগোয়নি প্রকল্পের কাজ। এরই মধ্যে প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে।
এদিকে আধুনিক ব্যবস্থার অভাবে অস্বাভাবিক বা অপমৃত্যুর শিকার ব্যক্তিদের মরদেহ নিয়ে অমানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন স্বজনরা। প্রাচীন এ জেলা শহরে আজও নেই মরদেহ সংরক্ষণের জন্য আধুনিক ব্যবস্থা। ময়নাতদন্তের জন্যও আলাদা করে নেই কোনো মর্গ। জেনারেল হাসপাতালের পরিত্যক্ত মোটরসাইকেল গ্যারেজে সংকীর্ণ কক্ষে চালানো হচ্ছে ময়নাতদন্তের কাজ। এক শয্যার লাশঘরে ধারণক্ষমতা না থাকায় মরদেহগুলি মেঝেতেই ফেলে রাখতে হয়। একটির ময়নাতদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাকিদের তীব্র গরমে সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
মগ্যম্যান দেবদাস চন্দ্র দাস বলেন, হাসপাতাল মর্গে একটার বেশি মরদেহ পোস্টমোর্টেম করা যায় না। একটির ময়নাতদন্ত শেষে আরেকটিকে ধরতে হয়। আবার অজ্ঞাত মরদেহের ক্ষেত্রে ভোগান্তি আরো বেশি। কারণ এই মর্গে মরদেহ সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই।
পাবনা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. জাহিদুল ইসলাম জানালেন, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা না থাকার কারণে মরদেহ সংরক্ষণ করা বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। ভোগান্তি দূর করতেই এখানে একটি আধুনিক মর্গ নির্মাণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, আধুনিক মর্গটি চালু হলে কেবল মরদেহ সংরক্ষণই নয়, ভিসেরা রিপোর্ট বা রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য সংগৃহীত আলামতগুলোও খুব সুন্দর ও নিরাপদ পরিবেশে সংরক্ষণ করা সম্ভব হতো। এছাড়া একটি আধুনিক মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় ডে-লাইট বা উপযুক্ত আলোর ব্যবস্থাসহ নানা ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকে। এর ফলে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের যে মূল কাজ, সেটি আরও নিখুঁত ও সহজ হতো।
এই সংকট কেবল স্থানীয় মরদেহের ক্ষেত্রেই নয়। কোনো প্রবাসী স্বজনদের শেষ দেখার আশায় মরদেহ সংরক্ষণ করা কিংবা কোনো পরিচয়হীন মরদেহ চেনার জন্য কিছুদিন রেখে দেওয়ার মতো কোনো প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা বর্তমানে পাবনায় নেই। ফলে পরিচয়হীন অনেক মরদেহ চেনার আগেই দ্রুত দাফন করে ফেলতে হচ্ছে। ময়নাতদন্ত ও মরদেহ সংরক্ষণ নিয়ে এই ঘোর সংকটে পুলিশ প্রশাসনও পড়েছে চরম বিপাকে।
এই ভোগান্তি দ্রুত নিরসন জরুরী জানিয়ে পাবনার পুলিশ সুপার আবু আশ্রাফ বলেন, আমাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়, আমাদের ১১টি থানার মধ্যে পাঁচটি থানায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ছোট লাশ ঘর তৈরি করেছি। যেখানে দুই থেকে তিনটির বেশি মরদেহ রাখা সম্ভব নয়। ফলে মরদেহের সংখ্যা বেশী হলে খুবই অসুবিধা হয়।
প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা এবং নতুন করে টেন্ডার আহ্বানের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে গণপূর্ত অফিসের কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সাথে নিয়ে এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে অল্প সময়েই আধুনিক মর্গটি সম্পন্নে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।