হরমুজে প্রভাব কমছে ইরানের!

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস ও শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে দেশটিতে যৌথ হামলা শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। তবে এই দুই লক্ষ্যের কোনোটিই অর্জন করতে পারেনি ওই দুই দেশ। উল্টো যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গুরুত্বপূর্ণ নৌ-পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ নিজেদের কব্জায় নিয়ে বিশ্বজুড়ে তেল বাণিজ্যকে চরম চাপে ফেলে তেহরান। পরবর্তী এই হরমুজ প্রণালিই হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায়। যুদ্ধকালীন থেকেই ইরান হরমুজকে তাদের ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। গত কয়েক মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র- উভয় পক্ষই হরমুজের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করেছে। দুই দেশের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে এ নিয়ে যথেষ্ট বিভ্রান্তি ও সংশয় তৈরি হয়েছে। গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে এমনটাই দাবি করা হয়েছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কেপলার বলছে, গত দুই সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করা ৮০ শতাংশের বেশি জাহাজ ওমানের পথ ব্যবহার করেছে।

ট্রান্সপন্ডার ও স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে কেপলার। সংস্থাটি বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ব্যাপক টহল ধীরে ধীরে হরমুজে তাদের নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছে; বিপরীতে ইরান তার নিয়ন্ত্রণের বড় অংশ হারাচ্ছে। ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সম্প্রতি বেশির ভাগ জাহাজ ইরানের দাবি উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর নিরাপত্তার আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে প্রণালিটি পার হওয়ার পথ বেছে নিয়েছে। কেপলারের অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান হোমায়ুন ফালাকশাহী বলেন ক্রমেই মনে হচ্ছে, ইরান প্রণালিটির ওপর অন্তত আংশিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। পিকারিং এনার্জি পার্টনার্সের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ড্যান পিকারিং বলেন, ইরানের টোল আদায়ের দাবি মেনে চলতে পশ্চিম এশিয়ার অধিকাংশ দেশই চায় না এবং তারা তা করছেও না। তাই ওমানের পথ ব্যবহার করাটাই নিঃসন্দেহে সবচেয়ে যুক্তিসংগত।

এক মাস আগের পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান অবস্থার বড় পার্থক্য রয়েছে। তখন কেপলার ওমানের পথ দিয়ে প্রায় কোনো জাহাজ চলাচলই দেখতে পায়নি। লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ডি লিপোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলবাহী জাহাজ ভেরি লার্জ ক্রুড অয়েল ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি) ভাড়া করেছে। এসব জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পারস্য উপসাগর থেকে বেরিয়ে ওমান উপসাগরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাইরে গিয়ে ক্রেতাদের জাহাজে তেল স্থানান্তর করছে। ইরানের হামলা এড়াতে তারা প্রায়ই টানা কয়েক সপ্তাহের জন্য নিজেদের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখছে। ফলে কথিত ‘ডার্ক ট্রাফিক’ কেপলারের মতো কিছু তথ্য-ট্র্যাকিং সেবার নজরও এড়িয়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। আবার স্যাটেলাইটের মাধ্যমে কিছু জাহাজ শনাক্ত করা গেলেও, প্রচলিত পদ্ধতিতে এগুলোর ওপর নজর রাখা কঠিন।

উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে, যার ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী প্রায় সব জাহাজের ওপর নজর রাখতে পারছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি তেল পরিবহনের যে পরিমাণের কথা জানিয়েছে, তা আগের সব পূর্বাভাসকে ছাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট গত সপ্তাহে দাবি করেন, এক সপ্তাহে প্রণালিটি দিয়ে যাওয়া এবং জলপথ এড়িয়ে অন্য পথে পাঠানো তেলের সম্মিলিত পরিমাণ ছিল প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল। যুদ্ধপূর্ব সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২ কোটি ব্যারেল। জ্বালানিমন্ত্রীর দাবির ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সোমবার ঘোষণা করেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে। যদিও সংঘাতজুড়েই তিনি এমন বিতর্কিত দাবি বারবার করেছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি যদি সত্য হয় তাহলে এক বা দুই মাস আগের তুলনায় হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ কমেছে এটা বলা যায়।

পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে ওমান-ইরানের মধ্যে আলোচনা। যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়েই তারা প্রণালিতে নৌযান চলাচলের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা করছে, যা ট্রাম্পকে বেশ হতাশ করেছে। ইতিমধ্যে ‘পথের কাঁটা হলে ওমানকে বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার’ হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। তবে ‘কীসের পথ’, সেটা স্পষ্ট করেননি তিনি। তবে এটি স্পষ্ট যে, হরমুজ প্রণালিই এখন এই যুদ্ধের মূল চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে।