কয়েক বছর আগেও যেখানে ছিল পদ্মা নদীর প্রবাহ, সেখানে এখন জেগে উঠেছে বিস্তীর্ণ চর। রাজশাহী শহরের কোলঘেঁষে পদ্মার বুকে গড়ে ওঠা নতুন এই চর এখন পরিণত হয়েছে দর্শনার্থীদের নতুন আকর্ষণে। প্রতিদিন শত শত মানুষ নৌকায় নদী পেরিয়ে সেখানে ঘুরতে যাচ্ছেন। তবে আকর্ষণের এই নতুন কেন্দ্র ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগও। অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে নৌকা চলাচল, লাইফ জ্যাকেট না থাকা, সন্ধ্যার পর অন্ধকারে নিরাপত্তাহীন পরিবেশ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান উপস্থিতি না থাকায় যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাজশাহী শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত পদ্মা নদীর মাঝখানে জেগে ওঠা নতুন চরটি এখন স্থানীয়ভাবে ‘মধ্যচর’ বা ‘মিডল চর’ নামে পরিচিত। চরটি কয়েক বছর আগে জেগে ওঠে। এখানে গত কয়েক দিনে মানুষের আনাগোনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দর্শনার্থীরা মূলত পদ্মার বিস্তীর্ণ বালুচর, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে সেখানে যান। অনেকেই ছবি তোলেন এবং বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজন নিয়ে সময় কাটান। সৌন্দর্য দেখে অনেকেই এই চরকে ‘মিনি সুইজারর্যান্ড’ বলছেন। রাজশাহী নগরীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ নৌকায় পদ্মা নদী পেরিয়ে সেখানে যাচ্ছেন। বিশেষ করে বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তরুণ-তরুণী ও কিশোর-কিশোরীদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। প্রতিদিন অন্তত পাঁচ-ছয়শ মানুষ সেখানে বেড়াতে যান। ছুটির দিনে দর্শনার্থীর সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছে যায়। নদীর পাড় থেকে এর দূরত্ব আড়াই-তিন কিলোমিটার। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় নদী পার হতে ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় লাগে। চরটির সুনির্দিষ্ট সরকারি পরিমাপ এখনো নির্ধারণ করা না হলেও এটি কয়েকশ একরজুড়ে বিস্তৃত বলে স্থানীয়দের ধারণা।
গত মঙ্গলবার নগরীর মিজানের মোড়সংলগ্ন নদীপাড়ে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই মানুষ নৌকায় মিডল চরের উদ্দেশে যাচ্ছেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ও বাড়ছে। নারী-পুরুষের পাশাপাশি তরুণ-তরুণীদের দলবেঁধে চরে যেতে দেখা যায়। ভ্রমণে যাওয়াদের বড় একটি অংশ ছাত্রছাত্রী। একেকটি নৌকায় ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি যাত্রী নিয়ে যাতায়াত করতে দেখা গেছে। যাত্রীদের কারও কাছেই লাইফ জ্যাকেট দেখা যায়নি। নৌকাতেও পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট বা অন্য কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছিল না।
প্রথম দিকে শুধু মিজানের মোড় ঘাট থেকে মানুষ চরে গিয়েছে। দিন যত যাচ্ছে আশপাশের আরও কয়েকটি ঘাট থেকেও মানুষ এই চরে যাচ্ছে ঘুরতে। মানুষের আনাগোনা বাড়ায় সেখানে অস্থায়ীভাবে চা, কফি, ফুচকা, কোমল পানীয় ও বিভিন্ন খাবারের দোকান বসেছে। তবে বৃষ্টি বা প্রতিকূল আবহাওয়ায় আশ্রয় নেওয়ার মতো স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা সেখানে নেই। কয়েকটি ছোট অস্থায়ী বাড়ি রয়েছে, সেগুলোতে অল্পসংখ্যক মানুষের আশ্রয় নেওয়া সম্ভব। স্থানীয়রা বলছেন, পদ্মায় পানি বাড়লে এই চর ডুবে যাবে। যে কদিন চর আছে সেই কদিন মানুষের আনাগোনা থাকবে। দর্শনার্থীদের অভিযোগ, নৌকাগুলো অনেকটা ইচ্ছেমতো চলাচল করছে। যাত্রী ওঠানোর সময় যাত্রী সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কিংবা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে মাঝনদীতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।
মাঝিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে মিডল চরে যাতায়াতের জন্য প্রায় ৮ থেকে ১০টি নৌকা চলাচল করছে। এসব নৌকায় যাত্রীপ্রতি যাওয়া-আসার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৫০ টাকা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাহিদুল ইসলাম বলেন, মিডল চরে আসা-যাওয়ার জন্য নৌকায় জনপ্রতি ৫০ টাকা করে নেওয়া হলেও নিরাপত্তার জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে একসে ঙ্গ অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে। তিনি জানান, সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে অনেক তরুণ-তরুণী আড্ডা দেন। কিশোর-কিশোরীরাও ঘোরাফেরা করেন। কিন্তু কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত সহায়তা করার মতো কোনো কর্তৃপক্ষ বা নিরাপত্তাকর্মী সেখানে নেই।
মিডল চরে গিয়ে দেখা যায়, তরুণ-তরুণী ও কিশোর-কিশোরীরা দলবেঁধে সেখানে অবস্থান করছেন। কেউ ঘুরছেন, কেউ আড্ডা দিচ্ছেন। পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে বিস্তীর্ণ এলাকা অন্ধকারে ডুবে যায়। কোনো লাইট বা পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই। নিরাপত্তার জন্য পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান কোনো উপস্থিতি নেই। সন্ধ্যা নেমে এলেও দর্শনার্থীদের ফিরে যাওয়ার তাগাদা দেওয়ায় কেউ নেই। ফলে সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। চরে সাপসহ বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি রয়েছে বলেও স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
দর্শনার্থীদের একটি অংশের অভিযোগ, এরই মধ্যে সেখানে বখাটেদের আনাগোনাও শুরু হয়েছে। ফলে সন্ধ্যার পর বিশেষ করে নারী ও কিশোরীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন অনেকে।
নৌকার মাঝিরা এখানে বেপরোয়া আচরণ করেন বলে জানা গেছে। নৌকায় লাইফ জ্যাকেট না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তাদের কিছুই হবে না বলে দাবি করেন। অতিরিক্ত যাত্রী তোলার বিষয়েও তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। যাত্রীরা এ নিয়ে আপত্তি জানালে মাঝিরা আমলে নেন না। তারা বলেন, আপনার ভালো লাগলে যান, না নাগলে না যান। আপনি না গেলে কতজন যাওয়ার জন্য বসে আছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী মহানগর নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক বিকাশ ম-ল বলেন, বিভিন্ন ঘাটে প্রায় প্রতিদিনই মাঝিদের সতর্ক করা হয়। নৌকায় যাত্রী পারাপারের সময় অন্তত জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম, বিশেষ করে লাইফ জ্যাকেট রাখার জন্য তাদের বলা হয়। তিনি বলেন, কেউ যদি নিজের নিরাপত্তার বিষয়টি নিজে গুরুত্ব না দেন, তাহলে পুলিশের পক্ষে প্রতিটি নৌকায় গিয়ে নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। নৌকার মালিক ও মাঝিদের পাশাপাশি যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে। মিডলচর নামে নতুন চর জেগে ওঠার বিষয়টি তাদের জানা ছিল না বলে জানান তিনি।
যাত্রীদের নিরাপত্তায় লাইফ জ্যাকেট দিল রাসিক : এদিকে দর্শনার্থীদের নিরাপদ নৌযাত্রা নিশ্চিত করতে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনের নির্দেশনায় লাইফ জ্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাজশাহী সিটি করপোরেশন কর্তৃক নগরীর মালেক ডগার ঘাটে নৌকার মাঝিদের মাঝে লাইফ জ্যাকেট প্রদান করেন। রাসিক প্রশাসকের পক্ষ থেকে সিটি করপোরেশনের সচিব সোহেল রানার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল মাঝিদের হাতে লাইফ জ্যাকেট তুলে দেন। রাসিকের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুল আলম এ সময় উপস্থিত ছিলেন।