ভোলা

৯ শিক্ষকেই চলছে ১২০০ শিক্ষার্থীর স্কুল

ভোলার চরফ্যাশন সরকারি টি. ব্যারেট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৯ শিক্ষক দিয়ে চলছে প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর পাঠদান। অনুমোদিত ১৭টি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৯ জন। শূন্য রয়েছে ৮টি শিক্ষক পদ। দীর্ঘদিন ধরে নেই প্রধান শিক্ষকও। সহকারী প্রধান শিক্ষক তাসলিমা বেগম ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। শুধু শিক্ষক নয়, বিদ্যালয়ের দুটি অফিস সহায়কের পদও শূন্য।

ফলে শিক্ষকস্বল্পতায় একদিকে ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত পাঠদান ও একাডেমিক কার্যক্রম, অন্যদিকে সীমিত জনবল দিয়ে প্রশাসনিক কাজ সামলাতে হচ্ছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে। ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে মাত্র ৯ শিক্ষক—শিক্ষক-শিক্ষার্থীর এমন ব্যবধান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকরাও।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কর্মরত ৯ শিক্ষককে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, ফলাফল প্রস্তুত, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শৃঙ্খলা পর্যবেক্ষণসহ নানা দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক পরীক্ষা, অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা, নবম শ্রেণির টেস্ট পরীক্ষা এবং এসএসসি পরীক্ষার সময় এই চাপ আরও বেড়ে যায়।

একই সময়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও বিপুলসংখ্যক উত্তরপত্র মূল্যায়নের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শিক্ষকদের অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হচ্ছে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না; শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, আচরণ, পড়াশোনার অগ্রগতি ও শৃঙ্খলা তদারকিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাই প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষকসংখ্যা কমে গেলে স্বাভাবিক একাডেমিক পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। বর্তমানে সহকারী প্রধান শিক্ষক তাসলিমা বেগম ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। নিয়মিত প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি তাঁকে বিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমও তদারকি করতে হচ্ছে।

অন্যদিকে দুটি অফিস সহায়কের পদ থাকলেও বর্তমানে কোনো অফিস সহায়ক নেই। এতে দাপ্তরিক কাজের চাপও পড়ছে বিদ্যমান জনবলের ওপর।

সম্প্রতি অভিভাবক সমাবেশেও শিক্ষক সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন কয়েকজন অভিভাবক। তাঁদের মতে, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক কম থাকায় পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের সার্বিক তদারকিও কঠিন হয়ে পড়ছে।

চরফ্যাশন সরকারি টি. ব্যারেট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র অভিভাবক ও শিক্ষাবিদ ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীকে মাত্র ৯ জন শিক্ষক দিয়ে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। দ্রুত শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজনে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে আপাতত সংকট মোকাবিলা করা দরকার।’

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তাসলিমা বেগম বলেন, ‘বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও জনবল সংকটের বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করব। সংকটের মধ্যেও ৯ জন শিক্ষক কঠোর পরিশ্রম করে নিয়মিত পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন।’

বিদ্যালয়ের সভাপতি ও চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোমানা আফরোজ বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক সংকট দূর করতে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।’

তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠান প্রধানের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজন হলে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হবে।

চরফ্যাশন সরকারি টি. ব্যারেট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের EIIN ১০১২৯৬। দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা ৮টি শিক্ষক পদ পূরণ না হওয়ায় সংকটটি দিন দিন প্রকট হচ্ছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপ বাড়ছে, আর শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান ও তদারকির বিষয়টি হয়ে উঠছে বড় চ্যালেঞ্জ।

এদিকে সরকারি শিক্ষক নিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনেও গত মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) পরিবর্তন এসেছে। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পিএসসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম পদত্যাগ করেছেন। দায়িত্বে থাকা সময়ে নিয়োগপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে দ্রুত বিসিএস শেষ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি।

পিএসসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগের সঙ্গে চরফ্যাশন সরকারি টি. ব্যারেট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকটের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। তবে বিদ্যালয়ের শূন্য পদগুলো পূরণে সরকারি নিয়োগপ্রক্রিয়া কতটা দ্রুত এগোয়, সেই প্রশ্নটি এখন নতুন করে সামনে এসেছে।

চরফ্যাশনের ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যালয়ে সীমিত জনবল নিয়েই শিক্ষকরা পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ১৭টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৮টি শূন্য রেখে দীর্ঘদিন একটি বড় বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক একাডেমিক পরিবেশ ধরে রাখা কতটা সম্ভব—সেটিই এখন অভিভাবক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন।

শূন্য পদ পূরণের পাশাপাশি নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত খণ্ডকালীন বা অতিথি শিক্ষক দিয়ে সাময়িক সংকট মোকাবিলার দাবি উঠেছে। কারণ ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর পাঠদান যেন শুধু ৯ শিক্ষকের অতিরিক্ত শ্রমের ওপর নির্ভর না করে, সে জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ চান সংশ্লিষ্টরা।

প্রশ্ন এখন একটাই—১৭টি পদের মধ্যে ৮টি শূন্য রেখে ৯ শিক্ষক দিয়ে আর কতদিন চলবে ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর এই সরকারি বিদ্যালয়?