একটি অন্যায় অভিযোগ কীভাবে এক লহমায় একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের সাজানো জীবন ও সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে, তার এক করুণ উদাহরণ জ্যাকব মার্টিন। সৌরভ গাঙ্গুলির অধিনায়কত্বে ভারতের নীল জার্সি গায়ে চাপিয়েছিলেন তিনি। ক্রিকেট মাঠে ৯ হাজারের বেশি রান করা এই মানুষটির জীবনের সবচেয়ে বড় এবং কঠিন ম্যাচটি কিন্তু বাইশ গজে ছিল না—ছিল আদালতের চত্বর, যা চলল দীর্ঘ ২২ বছর ধরে।
অবশেষে দিল্লির পাটিয়ালা হাউস কোর্টের রায়ে কাটল সেই দীর্ঘ অমাবস্যা। আদালতের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ—জ্যাকব মার্টিনের বিরুদ্ধে জালিয়াতি কিংবা অন্যায়ের কোনো প্রমাণ নেই। সম্মানজনকভাবে তাকে সমস্ত অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।
জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সেই অধ্যায়
২০০৪ সালে আজওয়া ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে একটি দল ইংল্যান্ডে খেলতে যায়। সেই দলের এক খেলোয়াড় ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে সেখানে থেকে যান এবং জাল ইমিগ্রেশন স্ট্যাম্প ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে ভারতে ফেরার পর বিমানব্দরে ধরা পড়েন সেই তরুণ।
কিন্তু তদন্তের চাকা যখন ঘুরতে শুরু করে, তখন সংবাদের শিরোনাম বানাতে এবং বড় নাম জড়ানোর উদ্দেশ্যে মূল এফআইআরে নাম না থাকা সত্ত্বেও বলির পাঁঠা করা হয় দেশের হয়ে ১০টি ওয়ানডে খেলা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার জ্যাকব মার্টিনকে।
কী হারিয়েছেন এই ২২ বছরে?
আইনের দীর্ঘ লড়াই শুধু তার মানসিক শান্তিই কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে জীবিকার পথও:
- রেলের চাকরি হারানো: অপরাধী হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার কারণে তাকে ভারতীয় রেলওয়ের চাকরিটি হারাতে হয়।
- বিসিসিআই-এর নীরবতা: কঠিন সময়ে পাশে পাননি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডকে। যে ক্রিকেটকে জীবন দিয়েছিলেন, সেই ক্রিকেট বোর্ডও হাত বাড়িয়ে দেয়নি।
- সামাজিক লাঞ্ছনা: সমাজ ও সংবাদমাধ্যমের চোখে সুদীর্ঘ ২২ বছর ধরে প্রতারণার তকমা বয়ে বেড়াতে হয়েছে তাকে।
"সুবিচার পেলাম, কিন্তু আমার ক্ষতিগুলো কে ফিরিয়ে দেবে?"
রায় ঘোষণার পর এক বুক কান্না আর চরম স্বস্তি নিয়ে আবেগপ্লুত কণ্ঠে মার্টিন বলেন:
"যে অন্যায় আমি করিনি, তার শাস্তি আমাকে ২২ বছর ধরে পেতে হলো। আমার নাম এফআইআরে ছিল না, কিন্তু আমি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার বলে প্রচার পাওয়ার জন্য আমাকে ফাঁসানো হলো। রেলের চাকরিটা গেল, বিসিসিআই পাশে দাঁড়াল না। কী পরিমাণ মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে দিন কেটেছে তা বোঝাতে পারব না। আজ সুবিচার পেলাম ঠিকই, কিন্তু এতগুলো বছরে আমার যে বিশাল ক্ষতি হয়ে গেল, তা কি আর কখনো ফিরে পাব? তবুও, নতুন করে আবার জীবন শুরু করার চেষ্টা করব।"
২২ বছর আগে যে তরুণ খেলোয়াড়ের দায়িত্বহীনতার কারণে মার্টিনের জীবন থমকে গিয়েছিল, আদালতের বিচারে আজ তিনি মুক্ত। কিন্তু ভক্তদের মনে প্রশ্ন থেকেই যায়—একটি ভুয়া অভিযোগের খেসারত হিসেবে যে হারানো সময়, চাকরি ও সম্মান তিনি হারিয়েছেন, তা কি কোনো আদালত বা সমাজ আর কোনোদিন ফিরিয়ে দিতে পারবে?