মটকায় খটকা

ইয়া মোটা এক মাটির মটকা। বেশ ভারি।

মটকার পেটটা গোলগাল। তবে গলাটা সরু। মুখটা হা করা। খালি। মানে মুখে কোনো ঢাকনা নেই।

তো পেটমোটা মটকাটা সেই সকালবেলা একটা মানুষের চওড়া ঘাড়ে চেপে বসেছে। আর সেই চওড়া ঘাড়ে চেপে পাহাড় বেয়ে উঠছে তো উঠছেই।

উঠতে উঠতে উঠতে...

উঠে গেল একেবারে পাহাড়ের মাথায়।

পাহাড়ের মাথায় একটা বাড়ি। পেটমোটা মটকাটা এই বাড়িতেই থাকবে।

বাড়ির সামনে একটা ছাতিম গাছ। পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে আছে কাত হয়ে। ছাতিম গাছের ছায়ায় এসে থামল মটকা।

তারপর ঘাড় থেকে নামল। নেমে দাঁড়াল ছাতিম তলায়।

কিন্তু এ কী!

ছাতিম তলায় দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই, হঠাৎ...

নড়ে উঠল মটকা।

আর নড়ে উঠতেই, পেটমোটা মটাকাটা কাত হয়ে গেল। আর কাত হতে না হতেই, গড়াতে শুরু করল।

গড়াতে গড়াতে গড়াতে...

নামতে লাগল নিচে।

আর দেখতে পেয়েই মটকার পেছন পেছন ছুটতে লাগল মানুষের দুটো পা। আর ছুটতে ছুটতে ছুটতে...

হঠাৎ কুঁ-উই কুঁ-উই!

আঁৎকে উঠল মানুষটা। এ কী! মটকার ভেতরে কে? কিটু নাকি!

হতে পারে। হয়তো খেলতে খেলতে মটকার ভেতর ঢুকে পড়েছে কিটু। আর তাতেই কাত হয়েছে মটকা। আর কাত হয়েই গড়িয়ে পড়ছে নিচের দিকে।

কিটুর বয়স কেবল এক মাস হলো! ভীষণ ছটফটে। মটকার ভেতর কিটু! ভাবতেই গা শিউরে উঠল মানুষটার। যেভাবেই হোক মটকাকে থামাতে হবে। হঠাৎ...

ঘেউ-উ ঘেউ-উ! কিটুর মায়ের গলা!

মটকার পাশে পাশে ছুটতে লাগল কিটুর মা। আর ঘেউ ঘেউ করতে লাগল। মটকার পেছনে আরও জোরে ছুটতে লাগল পা দুটো। আর ছুটতে ছুটতে ছুটতে...

আরে! ওই তো কিটু! সে-ও মটকার সঙ্গে সঙ্গে ছুটছে। পাশে পাশে ছুটছে কিটুর মা। হাঁফ ছাড়ল মানুষটা। যাক! কিটুর কিছু হয়নি।

কিন্তু কিটু নয়। কিটুর মা-ও নয়। তাহলে মটকার ভেতর কে? হঠাৎ...

মি-আঁউ!

পুপুর ডাক! ডাকটা মটকার ভেতর থেকে এলো বলে মনে হচ্ছে! তাহলে কি মটকার ভেতর পুপু! কোন ফাঁকে ঢুকেছে কে জানে! এ সময় তো পুপু পাড়া বেড়াতে বেরোয়। পাড়া না বেড়িয়ে মটকার ভেতর কেন ঢুকল কে জানে।

সকাল সকাল টাটকা মাছের কাঁটা চিবিয়েছিল পুপু। তারপর পাড়া বেড়াতেই বেরিয়েছিল। হেলে দুলে চারপায়ে হেঁটে যাচ্ছিল এ পথ দিয়ে। গতকাল একটা ইঁদুরের গর্ত দেখেছিল পুপু। গর্তের পাশে বসেও ছিল অনেক সময় ধরে। কিন্তু ইঁদুরটা গর্ত থেকে বেরোয়নি। আজও সেই গর্তের কাছে চুপ করে বসেছিল পুপু। আর তখনই হঠাৎ...

গড়িয়ে গড়িয়ে ছুটতে ছুটতে ওর লেজ মাড়িয়ে দিল মটকা। আর তাতেই ঘাবড়ে গিয়েছিল পুপু। আর তারপরই চেঁচিয়ে উঠেছিল, মি-আঁউ! মি-আঁউ!

উফ! বেপরোয়া মোটকু মটকা! পুপুর লেজ মাড়িয়েই আবার গড়াতে লাগল। আর গড়াতে গড়াতে গড়াতে...

কিটু নয়। কিটুর মা-ও নয়। পুপুও নয়। তাহলে মটকার ভেতর কে?

কে! কে! কে!

মটকার পেছন পেছন তখনও ছুটছিল পা দুটো। আর মটকার একপাশে কিটু। আরেক পাশে কিটুর মা।

আর মটকাটা গড়াতে গড়াতে ছুটতে লাগল।

আর ছুটতে ছুটতে হঠাৎ...

ঠাস!

মটকার মোটা পেটটা গেল ফেটে। আর অমনি ফাটা পেট থেকে বেরিয়ে এলো...

কী?

কিছুই না।

নাকি কিছু!

কিছু একটা তো ছিলই।

কী ছিল?

ছিল একটা ভূতের ছানা। মটকা থামতেই ছুটে এলো মা ভূত। মটকার ভাঙা পেটের ভেতর থেকে ছোঁ মেরে ছানাকে নিয়ে বেরিয়ে এলো। তারপর ছানাকে কোলে নিয়ে সাঁই করে উঠে গেল পাহাড়ের ওপর। আর বসল সেই ছাতিম গাছে। একটু আগে যেখানে সেই পেটমোটা মটকা ছিল।

ছাতিম গাছে মায়ের কোলে বসেও ছানাভূত ভয়ে কাঁপছিল থর থর করে। আর মা ভূত হাঁপাচ্ছিল। ধকল তো আর কম যায়নি!

মা ভূত বলল, ‘মটকার ভেতর ঢুকতে গেলি কেন?’

কাঁদতে কাঁদতে ছানাভূত বলল, ‘আমরা লুকোচুরি খেলছিলাম!’

‘তো!’

‘আমি ওই মটকার ভেতর গিয়ে লুকিয়েছিলাম।’

‘তারপর?’

‘হঠাৎ ওই মটকা গাড়ি হয়ে গেল। আর একজন যাত্রী নিয়েই ছুটতে লাগল। ছুটতে ছুটতে ছুটতে...’

বাকিটা আর বলতে পারল না ছানাভূত। ওকে থামিয়ে দিল মা ভূত। মুচকি হেসে মা ভূত বলল, ‘ওটা গাড়ি হয়ে যায়নি! কাত হয়ে পড়ে গিয়েছিল। তারপর গড়াতে শুরু করেছিল। তোকে ছোঁ মেরে না আনলে তো...’

এবার মায়ের বুকে মাথা রাখল ছানাভূত। ওর বুকটা এখনো কাঁপছে। থর থর।

থর থর। তার মাথাটা এখনো ঘুরছে।

ভন ভন। ভন ভন।